গদ্যঃ উদয় রায়

 

অসীম সম্ভাবনাময় কৃষক আন্দোলন




বেশ কয়েকটি বিরোধী দলের কড়া প্রতিরোধের মধ্যেই গত সেপ্টেম্বর মাসে লোকসভায় কৃষি ক্ষেত্র সংক্রান্ত তিনটি বিল পাশ হয়েছে যথা :-

(১) কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থা ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি)

(২) কৃষকের (ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা) মূল্য আশ্বাস এবং খামার পরিষেবার চুক্তির বিল,২০১০।

(৩) অত্যাবশ্যক পক্ষ (সংশোধনী) বিল, ২০২০

ভারতের এই কৃষি আইন এক বাক্যে ভালো বা মন্দ বলার মতো পরিস্থিতি নেই। কারণ ভারতে কৃষকদের মূল সমস্যাগুলি হল- কৃষিপন্যের লাভজনক দামের গ্যারেন্টি নেই, জমির উপর জীবিকার চাপ, স্বল্প উৎপাদনশীলতা, কৃষকদের উচ্চ ঋণগ্রস্থতা, গুদামজাত করনের জন্য পরিকাঠামোর অভাব ইত্যাদি।

            ভারতে জন সংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিজীবি, সেই কারনে এই ক্ষেত্রে সংস্কার খুবই জরুরী। কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তি দিচ্ছে, এর ফলে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, কৃষিক্ষেত্রে এমন পরিবর্তনের ফলে উন্নতির বিপরীতে প্রায়শই কৃষকদের আরও ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিনীতি বিশেষজ্ঞ দেবেন্দ্র শর্মা বলেছেন “কৃষকদের এভাবে মুক্ত বাজারে ছেড়ে দেওয়া আর নেকড়েরর সামনে দাঁড় করানো একই কথা”।

কৃষিকে কাব্যারের হাতে ছেড়ে দেবার যে সিদ্ধান্ত দেশের সরকার গ্রহণ করেছে কৃষকের সমৃদ্ধির যে পরিকল্পনার কথা বলছেন তা যুক্তি-যুক্ত নয়। কারণ বাজার সব সময় সংযত আচরন করে না। তা যদি করতো তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোপন্যের মূল্য কমার সাথে সাথে দেশে পেট্রোপন্যের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যেতো।

            ভালো মন্দ যাই হোক না কেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নয় কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন কৃষকরা। শীতের মধ্যে নিজেদের দাবিতে রাজপথে অনড়। ইতিমধ্যে  কয়েক জন কৃষক মারা গেছেন এই আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায়।  সুপ্রিম কোর্ট কৃষি আইন প্রয়োগে স্থগিতাদেশ জারি করেছে। সেই সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য সুপ্রিম কোর্ট কমিটি গড়েছে। এর পরেও কৃষক সমস্যা মেটার কোন আশা দেখা যাচ্ছে না।  কৃষকরা আইন প্রত্যাহারের দাবীতে সাধারণতন্ত্র দিবসে রাজধানীর রাজপথে ট্রাক্টর মিছিল করেছেন। এখন এই আন্দোলন আর দিল্লীর সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। এমত অবস্থায় হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরকে বাতিল করতে হল তাঁর পূর্ব নির্ধারিত কিষান মহাপঞ্চায়েত। বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত ৪০ টি কৃষান সংগঠনের নবম দফার বৈঠকও ব্যর্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী গ্যাস্টিন ট্রুডো সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন। বির্তক যাই হোক না কেন, স্বাধীন দেশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ কৃষক আন্দোলন, যা আমরা দেখেছি চোখের সামনে, তাকে  ছোট করার জন্য কোন ব্যক্তি বা মিডিয়া বলার চেষ্টা করছে এটি বৃহৎ কৃষকদের আন্দোলন অথবা এম.এস.পি বা সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ সাহায্য মূল্য বাতিল হয়ে যাবার ভয়ে আন্দোলন করছে। যদিও সরকার এম.এস. পি রক্ষার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য এবিষয়ে পার্লামেন্ট থেকে আইন করে ঘোষনা করুক সরকার।

            প্রচার যাই হোক এই আন্দোলন এখন আর শুধুমাত্র রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়। সিঙ্ঘু এবং বিশেষ করে টিকরী বর্ডারে হরিয়ানার কৃষকরা আছেন। এ-প্রশ্নে রাজস্থান এন.ডি.এ তে ফাটল ধরেছে। রাজস্থান সীমান্তে ও কৃষকদের অংশ গ্রহণ বাড়ছে। দমনপীড়নের মধ্যেও উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর সীমান্ত ও মধ্যপ্রদেশের কৃষকরা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। যাই হোক ফসলের নায্যদাম পাওয়ার সমস্যা একটি সর্বভারতীয় সমস্যা। তাই আন্দোলনের প্রভাব আছে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে। এই আন্দোলনে ৫০০ বেশী কৃষক সংগঠন আছে যা অভূতপূর্ব। এখান থেকে যে কর্পোরেট বিরোধ স্লোগান উঠছে তাতে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, কৃষক বনাম কর্পোরেট দ্বন্দ্ব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

            আসলে এ-দ্বন্দ্ব হচ্ছে আন্তজার্তি লগ্নিপুঁজির সাথে কৃষক সমাজের দ্বন্দ্ব। কৃষক আন্দোলনে এই সার্বিক ঐক্যের নেপথ্যে আসলে বিগত তিন দশকের নয়া উদারনীতি। যার অবধারিত পরিণতিতে বেড়েছে চাষের খরচ, বীজ, সার, কীটনাশকের আর তার থেকেই আত্মহত্যার মহামারী।

            এই অভূতপূর্ব ঐক্যই উদ্দীপ্ত করছে সমাজের বাকি অংশকে। বার্তা দিয়েছে এক নতুন অভিমুখের। এক বিকল্পের। এক নতুন ভোরের। বুক ভরা প্রত্যয় দিয়েই স্লোগান  উঠছে- “দৌলত কী অন্ধেরি রাত মে মেহনত কা সুরজ ঝুপা লিয়া/ দৌলত কী আন্ধেরি রাত সে হাম আগলে সাবেরা মাঙ্গেগে”।

            আসলে সরকার এমন একটি আইন করেছে যার অর্থ হল মৃত্যুদণ্ড। এখন বোঝাপাড়ার মাধ্যমে ঠিক করতে চাইছে সেটা ফাঁসিতে না গুলিতে হবে? তাই  দুবছরের জন্য স্থগিতাদেশ, কমিটি- কোন কিছুই দুর্বার কৃষক আন্দোলনকে সন্তুষ্ট করতে পারছেনা।

            পৌঢ় কৃষান উপরে ফেলছে পুলিশি ব্যারিকেড, তরুণ কৃষান বন্ধ করছে গ্যাস কামান, কৃষানী হাত উঁচুতে তুলে বলেছেন ‘ইনকিলাব হ্যায়’| গুরুদুয়ারায়, লঙ্গর, মসজিদে রান্না ঘর-ফুটে উঠছে এক অসাম্প্রদায়িক ভারত।

ছবিঃ অনুষ্টুপ লাই

No comments:

Post a Comment

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, কণাদ ...