থিয়েটার থেকে বলছিঃ উদয় শংকর মুখোপাধ্যায়




 কি জ্বলছে ওখানে?

দৃশ্য: এক


এখন আর নেই করোনার ভয়। খুল্লমখুল্লা সব। দোকান ,বাজার। শপিং মল।  বাস যাত্রা, টোটো, রিক্সা, ট্যাক্সি, দূরে যাবার ট্রেন, উড়ো জাহাজ... পুজোর কেনা ,পুজোর সাজ, সাজানো গোছানো আজ। সতেরোশো টাকা কিলো ইলিশ মাছের টাটকাত্ব দেখতে মাঝওয়ালার ঠোটে কাছে  চলে যাচ্ছে ঠোঁট,তাতেও শিলমোহর...সরষের তেল 160, পেট্রোল 100। 800 টাকার গ্যাস বাড়িতে আনিয়া কত্তাবাবু রান্না ঘরের দরজা খুলিয়া উঁকি মারিয়া বলিলেন...

○কি জ্বলছে ওখানে? 


দৃশ্য: দুই

ঘরছাড়া শ্রমিকরা বাড়ি ফিরলেন পায়ে হেঁটে সেই কবে করোনার সূচনাকালে কাজ হারিয়ে। মাথায়, কাঁধে, পেটে, পিঠে সন্তান মালপত্তর লটবহর নিয়ে।

600...900...1500...1700... কিলোমিটার পথ পেরিয়ে। পিছমোড়া করে বসলেন,স্যানিটাইজার স্প্রে  করা হলো। ফিরলেন বাড়ি। সঞ্চয়ের সব টুকু নিঃশেষ করে। ছমাস ঘরকন্না করলেন। কোভিড কোভিডের কাবাডি খেলায় রেললাইনে জিতে গেলো লাশ। লাশের খোলশ ছেড়ে ত্রাণের লাইনের ল্যাজ পড়লো আছড়ে। লাশ ছুটছে শ্মশানে...কাজ খুঁজছে।  কাজ। কাজ।কাজ। জ্বললো চিতার কাঠ। চিতার মুখে মাস্ক। গোপন গোপন ভয়। চিতার পিছে ভয় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো কাঠকে..

কি জ্বলছে ওখানে? 


দৃশ্য: তিন

পথে পথে সাদা চাঁদ.... গোল গোল। খড়ি মাটির সাদা গোল চাঁদ মাটিতে আসিছে নামিয়া। সরকারি চাঁদ। কলঙ্ক নেই কিন্তু এ চাঁদে। আছে চোখে পরার কাজল। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে লড়ে যাবে এই মনশাপাতার কাজল। লকডাউন করিয়া দিবে করোনাকে গোল গোল সাদা সাদা চাঁদ। তো চাঁদ মারে উঁকি মাঝে মাঝে চটি পায়ে দিয়া। সাদা চাঁদে ভরিয়া ওঠে নগর, জনপদ,মদের কাউন্টার,রেশনের দোকান। মাঝে মধ্যে স্কুল বাড়িতেও ওঠে চাঁদ। সাদা। হাজার গেরাম আলু, দুকৌটো চাল, গ্যালন গ্যালন ছোলা, সাদা কাপড়ের " জয় বাংলা" মুখোশে সাদা চাঁদ চোখ তোলে কেলাশ ফাইভে পড়া ছাত্রের টোটো চালানো বাপের পেটের পানে..... 

কি জ্বলছে ওখানে?? 


দৃশ্য: চার

আসিলো ধেয়ে ঝড়। নাম তার আমফান। এগিয়ে থাকা জ্যাঠামশাই বলেন ওর নাম উম্ফুন। গতির তান্ডব মাথার ছাদ ফুড়ে উপড়ে দেয় নিঃস্ব করে। এ ঝড় আসে নাম বদল করে বারে বারে। গলা জলে ক্যামেরা হাতে টিভি দেবতার বাইটে বাইটে গরিবের ভাঙা ঘর বিজ্ঞাপিত হয়ে বাজার খাওয়ানো হাঙর নাড়ে লেজ। এ এক গরম কেক। খদ্দেররা দেয় লাইন। স্টোরি হয় তৈরি। উড়ে যাওয়া ছাদের মাথায় সরকার নাচে। বিলি হয় তেরান থুরি ত্রান। ত্রান এর লাইনে গরিব নাই, নিঃস্ব নাই, সর্বহারা নাই.....ত্রানের চালের ভাত খায় আগুনখেকো দেশ চালক। সে চালক সব খায়...জল, জঙ্গল, ভিটে, মা, মাটি আর খায় মানুষও। গরিব,নিঃস্ব, সর্বহারারা ফ্যাল ফ্যাল করে চায়। পেটে জ্বলে আগুন। দেশ চালক উঁকি মারিয়া কয়... আহা! দেখি দেখি কি জ্বলিতেছে? 


দৃশ্য : পাঁচ

রাজধানীর রাজপথ..কালো রাস্তার মাটির স্তর বিক্রী হয় সস্তায়। এ রাস্তা সে রাস্তা বেয়ে চলিতেছে হাঙর। জলহীন পথে চলিতে অভ্যস্ত এ সবখেকো হাঙর। দেশ চালকের মাথার সুস্বাদু মুকুট খেতে তার ইচ্ছে বড়..এ হাঙর নয়ন খোলে...নাচে পিতামহ, পিতা, আর শুয়োরের ছা। সাদা- কালো শুয়োরের ছায়েরা এক্সচেঞ্জ করে রঙের। পিতামহ আহ্লাদিত হয়। পিতা রাজা হয়। রাজা মশাই বড়ই প্রজাবৎসল ...

শুয়োরের পিঠে চড়িয়া দেশ প্রদক্ষিণ করিতে করিতে রাজা মশাই কাঁদিয়া কন.... বড়ই কষ্টে কাটাতেছিলাম,এবার সুখ আসিবে দুয়ারে আমার। দুয়ারে দণ্ডায়মান পিতামহ কয়, কি কহিলি? কষ্টে কাটাতেছিলি আমার রাজ্যপাটে? তোর মতো পাপিষ্ঠকে আমি ত্যাজ্য করিলাম। রাগে একটি একটি করে অঙ্গ আমার জ্বলিয়া যাইতেছে... 

রাজা মশাই দাঁত ক্যালাইয়া পিতামহকে জিজ্ঞাসা করিলেন.. কি জ্বলিতেছে ?


ফেব্রুয়ারির এগারোয় একটা মৃতদেহ পেয়েছি আমরা। মরনের আগে যার ডান পায়ের জিন্সটা ছিলো ফাটা।কোলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় চুরমার হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে বিপ্লবের অগ্নিবাণে উচ্চারিত শ্লোগান " আমি আর বাঁচবোনি "... 


এখন আমাদের সামনের মঞ্চ ফাঁকা। প্রথম, দ্বিতীয়,তৃতীয় ঘন্টা কবেই গেছে বেজে। আমাদের সবার হাতে চতুর্থ ঘন্টা...দেশের ঘন্টা...

মহম্মদি বেগের তলোয়ার ছুটছে...কুসুমগ্রাম থেকে সাঙ্গলী, হুগলী থেকে দার্জিলিং। পর্দা ঐ তো খুলছে...

প্রিভিয়াস আবহ শুরু.... মৃদঙ্গ দিচ্ছে তাল.. 

প্রথম সংলাপ বলছে অভিনেতা.... 

"আমরা বাঁচবোনা???"

No comments:

Post a Comment

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, কণাদ ...