প্রতিপক্ষ
'জিততে গেলে মনের আগুনটা জ্বালিয়ে রাখতে হবে ' প্রাইমারি স্কুলের মোহিত স্যারের বলা কথাটা আজও ভুলিনি আমি ।অগ্নিভর সঙ্গে লড়াইয়ে বারবার জিততে চেয়েছি ।কিন্তু প্রতিবারই হেরে গেছি।অগ্নিভ আমার প্রাইমারী স্কুলের বন্ধু ।ক্লাস পরীক্ষায় ফার্স্ট হতাম আমি, কিন্তু অ্যানুয়ালে আমাকে টপকে যেত অগ্নিভ।আমার মা ছিলেন ঐ স্কুলের শিক্ষিকা ।রেজাল্টের আগের দিন বিকেলে মনখারাপ করে ঘর ঢুকে বলতেন 'এবারেও দু নম্বর পেয়ে এগিয়ে গেছে অগ্নিভ ।'শুনে জল টলটলে চোখ নিয়ে মায়ের দিকে তাকাতাম আমি। বুকে জড়িয়ে আমায় সান্ত্বনা দিতেন মা ' চেষ্টা কর পরের বারে ঠিক ফার্স্ট হবি ।' মুখে বললে কি হবে আমার এই পরাজয়ে মায়েরও যে কষ্ট হতো তা টের পেতাম । আরও ভালোভাবে বুঝতে পারতাম রাত্তিরে, বাবা - মায়ের মাঝখানে শুয়ে। আধো ঘুমে শুনতে পেতাম বাবা বোঝাচ্ছেন ' অগ্নি তো এখন ছোট, ও এখন রেজাল্টের কি বোঝে?'
-তবুও। আসলে আমি ওকে পড়াই তো, তাই তুমি ওর ফার্স্ট না হতে পারার কষ্টটা ফিল করতে পারবে না।
-দেখো সুজাতা জয়ে আনন্দ করতে কাউকে শেখাতে হয় না, তবে প্রত্যাখান বা পরাজয়ের বেদনা সহ্য করতে শিখতে হয়।না হলে
বড়ো হয়ে যেকোন পরাজয়ে ভেঙ্গে পড়বে।পরাজয় যদিও মেনে নিতে পারতাম, মেনে নিতে পারতাম না অগ্নিভর বিজয়ী হাসি।রেজাল্ট
আউটের লাইনে দাঁড়িয়ে চোখে জল এসে যেত আমার ।চোখের জল লুকানোর জন্য
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতাম ।দেখে আমার কাছে এসে দাঁড়াতেন মোহিত স্যার, স্কুলের হেডটিচার।মা কে উদ্দেশ্য করে বলতেন ' দিদিমণি দেখুন আপনার ছেলের কাণ্ড ।' আমার পাশে এসে দাঁড়াতেন মা।মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন ' কাঁদিস না বাবা।' অশ্রুসিক্ত চোখে দেখতাম ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে অগ্নিভ
।বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে যেত ।ওখানে দাঁড়াতে পারতাম না ।ছুটে
বেরিয়ে যেতাম লাইন থেকে ।স্কুলের পিছনে গিয়ে
কাঁদতে থাকতাম । স্কুলের পরিবেশ শান্ত হয়ে এলে বাড়ি ফেরার জন্য মা ডাকতে থাকেন
আমায়।ধীর পায়ে এসে দাঁড়াই মায়ের কাছে। মা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করেন ' কোথায় ছিলি এতক্ষণ ? কখন থেকে ডাকছি।' আমাদের মাঝে এসে পড়েন মোহিত স্যার । জিজ্ঞেস করেন ' মন ঠিক হলো?'আমার হয়ে উত্তর দ্যান মা 'কি যে হয় স্যার বুঝতে পারি না ।শেষ
মুহূর্তে এসে পিছিয়ে পড়ে।'মোহিত স্যার আমাকে লক্ষ্য
করেই দ্যান উত্তরটা ' জিততে গেলে মনের ভেতরে একটা আগুন
জ্বালাতে হবে।যতদিন এই আগুনটা জ্বলতে থাকবে ততদিন কোথাও কেউ হারাতে পারবে
না।'এরপর একটু থেমে বলতেন ' অগ্নিভকে দেখে বোঝা যায় না কিন্তু ওর মনে জেতার ক্ষিদেটা
প্রবল। আগে ছিলো না, কিন্তু ওর বাবা মারা যাবার
পরে এটা হয়েছে।'ওর বাবা নেই?শুনে মনটা আর্দ্র হয়ে ওঠে আমার। একটা সহানুভূতি জন্মে।আমার
পরাজয়ের দুঃখটা কমতে থাকে ।তবে সেটা মুহূর্তের জন্য ।পরক্ষণেই কানে বাজতে থাকে
মোহিত স্যারের বলা কথা গুলো। সিদ্ধান্ত
নিই, হারাবো অগ্নিভ কে, তা যেভাবেই হোক।তবু হেরে যাই।
পড়াশোনার জীবন শেষ হয়, শেষ হয় না আমার লড়াই।নেভেনা জেতার জন্য আমার
মনের আগুন। পরাজয়ের ঘটনা বারবার ঘটে আমার জীবনে।
তবে আর পরাজিত হতে হবে না আমায়।কারণ আজকের পর থেকে অগ্নিভর
সঙ্গে আমার কোন লড়াই নেই।লড়াই হবে কি করে আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে ওর
শরীর। পাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি।শিলাবতীর শ্মশান ঘাটে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভূত
অনুভূতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আনন্দে উদ্বেল হতে পারছি না,শোকের তীব্র অনুভূতিও প্রকাশ করতে পারছি না। বন্ধুর মৃত্যু
দুঃখজনক।প্রতিপক্ষের মৃত্যু স্বস্তিদায়ক জেনেও একটা অস্বস্তি ঘিরে রেখেছে
আমাকে।কারণ অগ্নিভর মা।জানি একমাত্র তিনিই প্রকৃত দুঃখ পেয়েছেন তার পুত্রের এই
অকাল মৃত্যুতে। অসময়ে মরতে হতো না ওকে।মরতে হয়েছে আমার সাথে লড়াইয়ের কারণে।আমি
জিততে চেয়েছি, আর অগ্নিভ জিতে গেছে।ওর সব জিত
মেনে নিলেও মানতে পারিনা অলোকানন্দার সাথে ওর বিয়েটা ।অলোকানন্দা আমার প্রেমিকা।
।ওকে প্রথম দেখি ওদের গ্রাম ভূতশহরে, ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে গিয়ে। একটা সময়ে ক্রিকেট খেলায় মজে ছিলাম আমরা
।ভারতবর্ষের হয়ে মাঠ দাপাচ্ছেন সচীন সৌরভ।সিমলাপাল একাদশের হয়ে মাঠে নামছি
আমি আর অগ্নিভ । ভূতশহরের ঐ ম্যাচটায় অগ্নিভ যেতে পারে নি।কিন্তু অগ্নিভ না থেকেও
যেন ছিল সবখানে । অন্যেরা শুধু নয় ক্ষণে ক্ষণে ওকে মিস করছি আমিও ।ওপেনিং
করতে নেমেছি আমি আর পলাশ, কিন্তু কিছুতেই তাল মিলছে না ওর
সাথে ।কিছুক্ষন ব্যাট করার পর রান আউট হয়ে যাই আমি ।হতাশ হয়ে ভাবি অগ্নিভ
থাকলে এমনটা হতো না ।বুঝতে পারি সহযোগিতা বা প্রতিযোগিতা সবকিছুতেই আমার যোগ্য
সহযোগী অগ্নিভই।তবে ব্যাটের অসফলতা
পুষিয়েদি বল হাতে।আর তাতেই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ।খেলতে খেলতে ঘটে গেল একটা অঘটন। আমার ওভার শেষ করে
এসে দাঁড়িয়েছি বাউন্ডারি লাইনে ।তখনই নজর পড়ে একটা বল ছিটকে এসে এগিয়ে
যাচ্ছে বাউন্ডারির দিকে।আটকানোর জন্য শরীরটাকে হাওয়াই ভাসিয়ে ঝাপিয়ে পড়ি বলটার
উপর।বলটা আটকে যায়।তবে কাঁকুরে মাটিতে পড়ে যাওয়ার হাত পা ছড়ে যায় আমার।দেখে
আমার কাছে ছুটে এসে দাঁড়ায় পক্ষ বিপক্ষ দু দলের ছেলেরা ।রোহন ভূতশহর টিমের
ক্যাপ্টেন বলে ' ইস অনেকটা ছড়ে গেছে, দাঁড়া জল আনি '। মাঠ ছেড়ে ও এগিয়ে যায় মাঠের পাশে পড়ে থাকা কালো পিচ রাস্তাটার দিকে ,তারপর হাঁক দেয় 'রিনি. ...রিনি এক বোতল জল নিয়ে আয় তো।'কিছুক্ষণ পর এক হলুদ চুড়িদার এসে দাঁড়ায় আমার সামনে।শ্যামলা
রঙের চোখে চশমা পরা মেয়েটি মনে হলো যেন এই রৌদ্রতপ্ত দুপুরে শীতল ছায়া নিয়ে এলো।
ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি দেখে মৃদু স্বরে বলে 'আমি জল ঢেলে দিচ্ছি, ধুয়ে নাও, রক্ত পড়ছে ।' ধোঁয়া হলে মেয়েটি চলে যায়, ওর চলে যাওয়া পথের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি
আমি ।ম্যাচ শেষে বাড়ি ফেরার পথের দুপাশে লাগানো সর্ষে ক্ষেত থেকে নাকে এসে লাগে
ফুটে থাকা সর্ষে ফুলের গন্ধ। ফুটে থাকা হলুদ ফুলের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি রিনির মুখ
ভেসে ওঠায়।কুসমীর নদীঘাটে দল বেঁধে নেমে পড়ি। সন্ধ্যা নামার আগে ধীর লয়ে বয়ে চলেছে
শ্রান্ত নদীর জল ।শেষ হয়ে আসা সূর্যের আলো আভা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে শ্রান্ত
নদীর জলে।রিনির মুখ খুঁজছি আমি শেষ বিকেলের আলোয়।ওখান থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা
নেমে আসে
অগ্নিভ খেলতে যায়নি বলে আমার ধারণা ছিল সন্ধ্যার সময়
ও দেখা করতে আসবে।না আসায় অবাক হই ।ভাবলাম আমিই যাই।গিয়ে দেখি
ওরা বাড়িতে নেই ।ওদের পাশের বাড়ির প্রভা কাকিমা আমাকে দেখে বলেন ' তুই জানিস না, অগ্নিভর মা তো হসপিটালে ভর্তি?
-সে কি, কেন? বিস্ময় ঝরে পড়ে আমার গলায়।
-শ্বাসকষ্টের জন্য । জানি অগ্নিভর মায়ের মাঝে মধ্যে
শ্বাসকষ্ট হয় ,কিন্তু এতোটা বাড়াবাড়ি
জানতাম না । আর দাঁড়াই না, দ্রুত পা চালাই হাসপাতালের দিকে। হাসপাতালে পৌঁছে আবিষ্কার
করি বেঞ্চিতে বসে থাকা অগ্নিভ কে।কাছে গিয়ে অস্থির গলায় জানতে চাই 'কাকিমা কেমন আছেন?'
-এখন একটু ভালো
-তুই এখানে?
-মা কে ফিমেল ওয়ার্ডে রেখেছে। ওখানে ভিজিটিং আওয়ার ছাড়া
পুরুষ প্রবেশ নিষেধ।
-ডাক্তার কি বলছে, এখানে হবে না বাঁকুড়া নিয়ে যেতে হবে?
-বলছে তো নিয়ে যেতে হবে না, এখানে অক্সিজেন দিয়ে রাখলে ঠিক হয়ে যাবে ।তবে দু
-তিনদিন ভর্তি থাকতে হবে
-ও। তা রাখতে হবে ।কি আর করবি। সুস্থ করে তো তুলতে হবে?
-হুম। অন্য কিছু নয়, আমার একটু অসুবিধা হয়ে গেল।
-কেন?
-কাল থেকে আমার কলেজে সেমিস্টার শুরু হবে। পরীক্ষাটা
না দিলে একটা সেমিস্টার পিছিয়ে যাবো। জানিসই তো মামা খরচা দিয়ে পড়াচ্ছেন... এদিকে
মা কে এই অবস্থায় ফেলে যাই কি করে?না আমার অজানা নয়। উচ্চমাধ্যমিকে অগ্নিভ বা আমার দুজনের কারোও আশানুরূপ
ফল হয়নি ।তবে অগ্নিভর ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তির তালিকাতে নাম ছিল। সেই সুবাদে
দুর্গাপুরের একটা বেসরকারী কলেজে ভর্তি হয়ে যায় অগ্নিভ। ভর্তির
আগে চিন্তিত ছিল খরচ নিয়ে। কারণ ওর বাবা মারা যাবার পর দেখেছে ওর মা কতটা
পরিশ্রম করে ওকে পড়াচ্ছেন। তাই প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে রাজী ছিল না বলেছিল ' জেনারেল লাইনেই পড়বো, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খরচ অনেক, অত খরচা আসবে কোত্থেকে ?'তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ওর মামা' তুই পড়, আমি খরচ দেব।'মামার প্রস্তাবে প্রথমে রাজী হয় নি
অগ্নিভ। বলেছিল ' কেন মামা জেনারেল লাইনে পড়ে কি
কেউ চাকরি পাচ্ছে না? '
-তা কেন,তবে তাতে অনেক সময় লাগবে।অত দিন
ধরে খরচ জোগানোও তো তোর মায়ের পক্ষে জটিল। আর তুই এখন বড়ো হয়েছিস, বুঝতেই তো পারছিস তোর বাবা মারা যাবার সময়ে সে রকম কিছু
রেখে যেতে পারেন নি ।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে তাড়াতাড়ি যাইহোক একটা কিছু পাবি আশা করা যায়।তাই বলছিলাম আর
কি? ওর মামার সাথে যোগ দ্যান ওর মা ' মামা যখন বলছেন ,তখন আর আপত্তি করিস না।' আর আপত্তি করে নি অগ্নিভ। ওর
ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়াটা মানতে পারলাম না
আমি। বাড়িতে বলতে লাগলাম আমাকে বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দাও।ভুবনেশ্বর বা
ব্যাঙ্গালুরুতে,ওখানে পরীক্ষা ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ারিং
এ ভর্তি হওয়া যায়।
-তা যায়, তবে ওখান থেকে পড়ে এসে লাভ কি হবে
তোর। ঐ তো তোর মঞ্জু মাসির ছেলে কোথা থেকে একটা পড়ে এলো, পড়ে কী হলো, সেই তো এসে ঘরে বসে আছে।
-কিন্তু মা অগ্নিভ আমার চেয়ে আগে চাকরি পেয়ে যাবে?
-নাও পেতে পারে । আগে পরেটা ব্যাপার নয়। ভালো চাকরি পাওয়াটা
ব্যাপার।
-জেনারেল লাইনে পড়ে কী ভালো চাকরি পাবো মা?
-কেন, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কী কোন ভালো চাকরি নেই? তোর বাবা যেমন বলছে তেমন ও করতে পারিস , পাঁচমুড়া কলেজ থেকে ইংলিশ নিয়ে পড়ে ,কলকাতা গিয়ে কোচিং নিয়ে বি সি এস দে।নতুবা মাস্টার্স
কমপ্লিট করে নেট বা স্লেট দিয়ে কলেজে পড়া।
বাবা -মা এর ইচ্ছেমত পাঁচমুড়া কলেজে ভর্তি হলাম
কিন্তু কেন জানি না খালি মনে হতে লাগলো অগ্নিভর চেয়ে পিছিয়ে গেলাম অনেকখানি ।ওর
সাথে দেখা হলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাই ' ক্যাম্পাসিং হয় ,তোর কলেজে?'
-হয় তবে সে রকম ভালো কোম্পানি আসে না ।শুনে খুশি
হই।আসলে ওর আমার চেয়ে ভালো কিছু হোক তা আমি চাই না।
-তবে প্রাইভেট কোম্পানি তে আমার যাবার ইচ্ছে নেই , কারণ সেক্ষেত্রে আমাকে মা কে ছেড়ে যেতে হবে ।মাকে একা ছেড়ে
আমি কোথাও যেতে পারবো না।
-তবে?জানতে চাই আমি ।
-ভাবছি বি. টেক কমপ্লিট করে সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলো দেব।
এবার ধক করে লাগে আমার বুকে, তারমানে ও আমার আগে চাকরি
পাবে।ভাবতে কষ্ট হয় আমার ।বুঝতে পারি পাশাপাশি থাকলেও ও আমার যতটা না বন্ধু
হয়ে উঠেছে, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে
প্রতিপক্ষ ।
প্রতিপক্ষ হলেও ওর এই বিপদের দিনে আমি ওর পাশে না দাঁড়িয়ে
পারলাম না ।ওর পরীক্ষা আছে শুনে বললাম, ' ঠিক আছে তুই কাল চলে যা পরীক্ষা দিতে, আমি থাকবো কাকিমার কাছে ।'
- কাল তোর কলেজ নেই ?
-পরশু কলেজে একটা অনুষ্ঠান আছে, তাই কলেজে কাল তেমন ক্লাস হবে না।
- তোর অসুবিধা নেই তো? দ্বিধাগ্রস্থ স্বরে জানতে চায় অগ্নিভ।
-ধুর কি যে বলিস, তোর জেনুইন অসুবিধা আছে।আমি একটা দিন কাকিমার কাছে থাকতে পারবো না।
আসলে সেই সময়ে মফস্বলে পাশাপাশি বেড়ে ওঠার সময়ে শুধু
প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবেই তৈরী হতো না, পরিবার গুলো এমন ভাবে জড়িয়ে রাখতো যে সহযোগিতা হৃদয়ের গভীর থেকে আসতো।এর
ব্যতিক্রম আমিও ছিলাম না ।আর তাই অগ্নিভর মায়ের জন্য একটা দিন হাসপাতালে
কাটাতে আমার কোন অসুবিধা হয় নি ।
একদিন পর কলেজ এলাম, তাতেই যে আমার জন্য এতটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল
জানতাম না । সেদিন ভূতশহরে ক্রিকেট মাঠে আমার জন্য জল নিয়ে আসা রিনিকে আবিষ্কার
করলাম অলকানন্দা ষন্নিগ্রহী হিসাবে ।এই কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী হিসেবে ওকে
আবিষ্কার করে যত না অবাক হলাম, তার চেয়েও বেশী পুলকিত হলাম । আজ
ভিন্ন সাজে অপরূপা হয়ে উঠেছে অলোকানন্দা ।বান্ধবীদের দলে যেন প্রজাপতি হয়ে ঘুরে
বেড়াচ্ছে কলেজ ক্যাম্পাসে ।আমাকে দেখে এগিয়ে আসে, ' তুমি এই কলেজে পড়ো?'
-হুম , ইংলিশ অনার্স,
থার্ড ইয়ার ।তুমি ।
-এই বছরেই ভর্তি হয়েছি ভূগোলে। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান
আজ।স্বাভাবিক ভাবেই বাঁধনছাড়া পরিবেশ।বাঁধনহীনতা প্রগলভ করে তুলে আমাদের।সেই
প্রগলভতায় আমি সঙ্গ লোভী হই অলকানন্দার।পরিবেশে বসন্তের বাতাস। সেই বাতাসের
ছোঁয়ায় আমার, ওর সঙ্গলাভের ইচ্ছাকে প্রশয়
দেয় অলকানন্দা । প্রশংসা ঝরে পড়ে ওর মুখে ' সেদিন তুমি একাই হারিয়ে দিলে আমাদের। '
- তুমি ক্রিকেট দেখ
-হুম
-বোঝো ক্রিকেট? গলায় রসিকতা ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করি ।
-হুম , না বোঝার কি আছে? তুমি কি ভাবো ছেলেরাই শুধু ক্রিকেট
বোঝে?তর্ক বাড়াই না ।ওর পাশে হেঁটে যাই
চুপচাপ । পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অসতর্ক মুহূর্তে আমার শরীর ছুঁয়ে যায়, অলকানন্দার শরীর।রোমাঞ্চিত হই । নীল শাড়িতে সেজেছে অলকানন্দা ।ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক ।শরীরে মিস্টি
পারফিউমের গন্ধ চুম্বকের মতো ওর দিকে টেনে রেখেছে আমাকে।বিকেলের অনুষ্ঠান
।শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ । দিনের আলো নিভে এসেছে ।মঞ্চে গান বাজছে "কিছু
পরে দূরে তারা জ্বলবে/হয়তো তখন তুমি বলবে।" আলো আঁধারী তে ওর পাশে হাঁটতে
হাঁটতে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে আমার মনে । খুব ভালো লেগে যায়
অলকানন্দাকে ।বড় নিজের মনে হয়।হাঁটতে হাঁটতে কলেজ ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে চলে
এসেছি আমরা । এই দিকটায় রয়েছে শাল গাছের জঙ্গল ।পাতা ঝরার মরসুম
এটা।জ্যোৎস্না গায়ে মেখে আলতো বাতাসে দোল খেতে খেতে টুপটাপ খসে পড়ছে বড় বড়
গাছের পাতা।আমার মনের বর্তমান অবস্থার মতো, এই সময় বড় রিক্ত মনে হয় বড় বড় গাছ গুলোকে।ইচ্ছে করে টুক করে
আমার মনের ভেতরে বসিয়ে ফেলি অলকানন্দাকে ।কিন্তু ও যদি রাজি না হয়?দোলাচলে দুলতে থাকে আমার মন।ভয় পেয়ে যাই আমি । হঠাৎ ডেকে
উঠি ওর নাম ধরে ' অলকানন্দা? '
-হুম ।পুরো মুখ ঘুরিয়ে তাকায় আমার দিকে । দেখে মনে হয়
পুরো চাঁদ আলো এসে জড়ো হয়েছে এই মেয়ের মুখে ।দৃষ্টি ফেরাতে পারি না । হুঁশ
ফেরায় অলকানন্দা ।' অনেক দেরী হয়ে গেল ।ফিরতে হবে
এবার ।'
-কার সঙ্গে ফিরবে?
-বন্ধুদের সঙ্গে ।
-আমি যদি পৌঁছে দি?
-তুমি কিসে এসেছো?
-বাইকে
-যাবো চলো।হেসে বলে অলকানন্দা ।চাঁদ আলো গায়ে মেখে, আকাশ ভরা তারাদের দৃষ্টির সামনে দিয়ে অলকানন্দাকে
বাইকে আমার পিছনে চাপিয়ে ফিরতে থাকি আমি । অকারণে উচ্ছ্বসিত মনে হয়
চারপাশ । হঠাৎ জোরে ব্রেক কষে বাইক দাঁড় করাই আমি।হুমড়ি খেয়ে আমার উপর পড়ে
অলকানন্দা ।' কি হলো? 'উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায় ও।' সামনে একটা বাম্পার ছিল । বুঝতে পারি নি।বলি আমি।
-কই ,বাম্পার তো নেই?
অলকানন্দার কথায় গলায় কৌতুক ফুটিয়ে আমি বলি 'ছিল, তুমি বুঝতে পারো নি।'আমার কাঁধে আলতো চাপড় মেরে অলকানন্দা বলে ' বুঝেছি '।
-কী?
-মেয়েরা পিছনে থাকলে ছেলেরা যে লোভে ব্রেক কষে তুমিও
সেই কারণে ব্রেক কষেছো।
-কিসের লোভে?
-জানি না যাও।
-জানো, বলো।
-না না না বলতে বলতে এবার ইচ্ছে করে ও
আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আমার।
প্রশয়ে প্রেম বাড়ে।প্রেম সাহসী করে ।প্রেমের সাহসে এখন অলকানন্দা আমার বাইকে চাপতে দ্বিধাগ্রস্থ হয় না আর।ওকে চাপিয়ে নিয়ে কলেজ ফাঁকি দিয়ে অনায়াসে পাড়ি দি দূর দূরান্ত ।আমার কলেজ জীবন শেষের মুখে । জানি শেষ হয়ে আসছে সিমলাপালের দিন। এরপর কলকাতা চলে যেতে হবে আমায়। অলকানন্দাকে ছেড়ে যেতে হবে ভাবলে মনটা হু হু করে ওঠে ।আঁকড়ে ধরি ওকে।'কি হলো? 'গাঢ় স্বরে জানতে চায় অলকানন্দা । উত্তর না দিয়ে আমার ঠোঁট নামিয়ে দি ওর ঠোঁটে। বাধা দেয় না ও।আরও বেশি সাহসী হতে চাই আমি। এবার আমাকে বাধা দেয় অলকানন্দা । উঠে দাঁড়ায় আমার পাশে।বলে ওঠে ' অনেক দেরী হয়ে গেল। এবার ফিরতে হবে।' বলে হাঁটতে শুরু করে ও।নীলকুঠির মাঠ ছাড়িয়ে পাকা রাস্তায় উঠে ক্রমশ ছোট হতে হতে আমার চোখের আড়ালে চলে যায়। তখন ফাঁকা মাঠের দখল নিতে শুরু করেছে নেমে আসা অন্ধকার ।অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে থাকা একা দাঁড়িয়ে থাকা বট গাছটার মতো মনে হয় নিজেকে। অলোকানন্দা চলে যাবার পর নিজেকে বড় একা লাগে।কলকাতা চলে যেতে হবে ভাবলে একাকিত্ব গ্রাস করে আমাকে।
অলকানন্দাকে একথা বললে ও বলে ' আমার মন খারাপ হয় না? কিন্তু মন খারাপ করে বসে থাকলে তো চলবে না । তোমাকে নিজের পায়ে
দাঁড়াতে হবে অনুময়, নিজের পায়ে দাঁড়ালে স্বীকৃতি মিলবে
আমাদের সম্পর্কের ।বাড়িতে বলতে পারবো তোমার কথা ।বুঝতেই পারছো গোঁড়া
ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে আমি । আমাদের এই সম্পর্ক এমনিতেই মানার
সম্ভাবনা কম।
-না, মানলে, তোমাকে নিয়ে পালাবো আমি ।
-পালতে গেলে ধরে রাখার মতো পায়ের তলায় শক্ত মাটি চাই।চাকরি
না পেলে সেটা সম্ভব নয়। এরপর ভরসা দেয় ' আমার বিশ্বাস তুমি চেষ্টা করলেই পারবে।আমার জন্য এইটুকু করতে পারবে না?
'
-পারতেই হবে আমাকে।মুখে বললে কি হবে চাকরি পেতে গেলে যতটা খাটা দরকার সেই হারে খাটা
হয় না ।কলকাতায় থাকতে পারি না আমি ।বাড়ির জন্য মন খারাপ হয় ।অলকানন্দা টানতে
থাকে সবসময়।বাড়ি এলে অখুশি হন বাবা ' এত ঘন ঘন বাড়ি এলে চাকরি হবে?চাকরি পেতে হলে একটা দুটো
বছর একটু কষ্ট করে থাকতে হবে ।এমনিতেই ফাইনাল ইয়ারের রেজাল্ট ভালো করতে পারলি না ।
চুপ করে থাকি আমি ।আমার বার বার আসা পছন্দ করে না
অলকানন্দাও।স্পষ্ট বলে 'এই ভাবে তোমার চাকরি হবে? চাকরি না হলে আমাকে পাবে?
না আমি অলকানন্দা কে পাই নি, যদিও চাকরি পেয়েছিলাম । আসলে যতদিনে চাকরি পেয়েছিলাম ততদিন
অপেক্ষা করা সম্ভব হয় নি অলকানন্দার।চাকরি না পাবার কারণ সিরিয়াস হতে না পারা।মা
বোঝান ' বাবা একটু ভালো করে চেষ্টা কর।বয়স
পেরিয়ে গেলে তখন আপশোষ করতে হবে ।'
আপশোষ করতে হয়েছিল বয়স পেরিয়ে যাবার জন্য নয়, অগ্নিভ আমার আগে চাকরি পেয়ে যাবার জন্য ।
ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার দু বছর পর ব্যাঙ্কিং
সার্ভিস এ যোগ দেয় অগ্নিভ ।অন্যদিকে কলকাতায় আমার আসা তিন বছর
হয়ে গেলেও একটিও চাকরি পরীক্ষায় পাশ করতে পারি নি।ওর চাকরি পাবার খবরে যতটা না
দুঃখ পেয়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ পেলাম
যেদিন অগ্নিভ আমার এখান থেকে মুম্বই গেল ট্রেনিং এ।ওকে দেখে মনে
হলো আমার চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেল অগ্নিভ ।সেখানে পৌঁছানো হয়তো আমার পক্ষে
কোনদিনই সম্ভব হবে না ।তবে ভেতরে ভেতরে একটা তাড়না অনুভব করি
ওকে টপকে যাবার জন্য ।
চাকরি পেয়ে উচ্ছ্বসিত অগ্নিভ, ' চাকরি পেয়ে আমার সবচেয়ে ভালো লাগছে এটা ভেবে যে আমার মাকে
আর কষ্ট করতে হবে না ।'
-সে তো নিশ্চয়ই ।কাকিমা প্রচুর কষ্ট করেছেন তোর জন্য ।
উৎসাহ দেয় ' তুইও ভালো চাকরি পাবি, একটু চেষ্টা কর।'খবর নেয় আমার ' তোর প্রেমের কী খবর?
'
-ওই চলছে আর কি ।লাজুক হেসে উত্তর দি আমি।অলকানন্দার
ছবি দেখাই ওকে।দেখে বলে ' তোর প্রেমিকা বেশ সুন্দরী ।চালিয়ে
যা।স্বনির্ভরতা আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়,বড় করে তোলে হঠাৎই । অগ্নিভ কে দেখে আমার সেই কথাটাই মনে
হলো।সর্বোপরি মনে হলো , এবার সত্যি সত্যি আমাকে
হারিয়ে দিল অগ্নিভ।মনে মনে টের পেলাম এতদিন ঘুমিয়ে থাকা আগুনটা জ্বলে
উঠেছে আবার ।ট্রেন ধরার জন্য আমার মেস ছেড়ে অগ্নিভ বেরিয়ে যাবার পর
স্থির রাখতে পারি না নিজেকে ।ভাবি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চাকরি পেতে হবে আমাকে।
আমার চাকরি পাবার থেকেও
তাড়াতাড়ি ঘটে গেল ঘটনাটা।ছ’মাসের ট্রেনিং থেকে ফিরে এসে
আরামবাগে একটা রষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে অগ্নিভ। ইচ্ছে
ওর মাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।তবে তার আগে তিনি চান অগ্নিভর বিয়ে দিতে
। ওর মায়ের ইচ্ছেতে খুব একটা অমত নেই অগ্নিভর ।পাত্রীও মোটামুটি ঠিক হয়ে
গেছে।পরপর কয়েকটা সরকারি চাকরির পরীক্ষা ছিল ফলে বাড়ি আসা হয়নি আমার ।ফলত
দেখাও হয়নি অলকানন্দার সঙ্গে ।শেষবার যখন এসেছিলাম তখন মন ভালো ছিল না ওর ।বারবার
বলছিল ' সমন্ধ দেখছে বাড়ি থেকে ।'
-আমার কথা বলো নি বাড়িতে
-বোন বলেছিল মাকে
-কি বলছে?
-সম্ভব নয়।কি করে মানবে একে তোমরা ব্রাহ্মণ নও , তার উপর কিছু জোটাতে পারলে না ।কতদিন ধরে বললাম একটা
কিছু করো যাতে ওটার উপর জোর দিয়ে বাড়িতে কিছু বলতে পারি।শুনলেই না।
কিছু বলি না আমি ।চুপচাপ বসে থাকি ।দুঃখ হয় কিছু করতে না
পারার জন্য ।শিলাবতীর জল তখন ক্রমশ কালো হচ্ছে শেষ বিকেলের ছায়ায়।অলকানন্দা বলে
যায় জানোই তো বাবার শরীর ভালো নেই।আমার পিছনে বোন রয়েছে । আমাদের উৎকল ব্রাহ্মণদের
বিয়েতে দেনা পাওনা প্রচুর ।তাই অন্তত একজনের বিয়ে দিয়ে কিছুটা নিশ্চিত হতে
চান ।বাবার শরীরের কথা ভেবে বাবার বিপক্ষে যেতে সাহস হয় না আমার ।যদি কিছু
অঘটন ঘটে যায়? নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না সারা
জীবন ।অন্ধকারে মুখ ঢেকেছে আগেই এবার স্বরও থেমে যায় অলকানন্দার
।খুঁজে পাই না কিভাবে ওকে ভরসা দেব আমি।তাই চুপচাপ বসে থাকি
।অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশিক্ষণই আমার
পাশে বসে থাকে অলকানন্দা ।তারপর উঠে দাঁড়ায়। আমি জিজ্ঞেস করি 'চলে যাবে? '
-হুম ।
-বেশ এসো।একটু ইতস্তত করে ও তারপর আমাকে
জিজ্ঞেস করে 'তুমি এখন যাবে না ?'
-যাবো একটু বসি
-ফাঁকা জায়গা ।বেশিক্ষণ বসো না ।ঠান্ডা লেগে যাবে ।তোমার
আবার অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায়। ।অলকানন্দা চলে যেতেই সিগারেট ধরাই আমি
।দুটান দিয়ে ভালো লাগে না ।ছুঁড়ে দূরে ফেলে দি।পরদিন সকালে কলকাতা চলে যাই।
মাসখানেক পরে পরীক্ষা দিয়ে ফিরে
এসে অলকানন্দাকে বলতে চেয়েছিলাম 'আর কটাদিন অপেক্ষা করো ,চাকরি পেতে আমার আর দেরী হবে না ।'তবে সেই সুযোগ পাই নি ।ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ।
ওর বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার খবর শুনে আশ্চর্য হই নি, আশ্চর্য হয়ে ছিলাম পাত্রের নাম শুনে । অগ্নিভর সঙ্গে
ওর বিয়ে হওয়াটা মেনে নিতে পারি নি আমি ।বারবার মনে হয়েছিল বন্ধু হয়ে এটা ও
কি করলো ?অলকানন্দা যে আমার প্রেমিকা সে কথা
তো অগ্নিভর অজানা ছিল না ।তা সত্ত্বেও কিভাবে এই বিয়েতে রাজী হলো ও?তবে কি ছোটবেলা থেকে সব দিন আমাকে হারিয়েই সুখ পেয়েছে ও?আর আমার ভালোবাসা অলকানন্দাকে বিয়ে করে বোঝাতে চেয়েছে, চাইলেই আমার সর্বস্ব কেড়ে নিঃস্ব করে দিতে পারে আমায়।
একবার ভেবেছিলাম অলকানন্দার কাছে যাবো।বলবো ওকে 'প্লিজ অলকানন্দা তুমি যাকে খুশী বিয়ে করো, শুধু অগ্নিভকে করো না , ওকে বিয়ে করলে আমি খুব দুঃখ পাবো।'কিন্তু যেতে পারি নি ।কান্না লুকিয়ে গৃহবন্দী করেছিলাম
নিজেকে।মা জিজ্ঞেস করেছিলেন 'তোর কী হয়েছে রে অনুময়?'
আসল কথাটা বলতে পারিনি মাকে।জড়িয়ে ধরি ছেলেবেলার মতো ।মাথায়
হাত বুলিয়ে দেন মা।কান্না এসে থমকে দাঁড়ায় আমার গলায়। বলি
'লাইটের সুইচটা একটু অফ করে দাও না মা।'অন্ধকারের আড়ালে নিজেকে লুকিয়েও স্বস্তি পাই না
।পরাজয়ের গ্লানি অনবরত বিদ্ধ করতে থাকে আমাকে।মেনে নিতে পারি না প্রতিপক্ষের
কাছে বারবার এই পরাজয়।মেনে নিতে পারি না বলেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি ।
কলকাতা ফিরে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করি চাকরির
আশায়।সিমলাপাল আসতে ইচ্ছে করে না আর।মাঝখানে আসতে হয়েছিল একদিন বাবা
হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায়।বাড়ি এলেও বেরোতে ইচ্ছে করে না আর।বেরোলে আদিগন্ত
নীলকুঠির মাঠ, ঢিমে তালে বয়ে চলা শিলাবতী, অলকানন্দার সাথে নিভৃতে কাটানো পাওয়ারহাউসের পিছন বুক ঠেলে
কান্না বার করে আমার ।মনে হয় স্মৃতি তা যতই সুখের হোক, পরিস্থিতি অনুযায়ী তা দুঃখেরও কারণ হয়ে উঠতে
পারে।দুঃখ ভুলে থাকতে চাই বলে সিমলাপাল আসতে চাই না ।কলকাতায় ভালো না লাগলে
মেট্রো তে চেপে ঘুরে বেড়াই, গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে থাকি , ধর্মতলায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, লোক দেখি , সিমলাপালের বাস দেখে অলকানন্দাকে
মনে পড়ে, ওর মুখটা মনে পড়লে বুকটা দুঃখে ভরে
ওঠে। ছুটে আসি মেসে।রাগ হয় মনে মনে ।মনের ভেতরে আগুনটা জ্বলে ওঠে আমার ।জিততে চাই
আমি, অন্তত একবারের জন্য হলেও ।
আমার চাকরিটা হয়ে ছিল
অপ্রত্যাশিত ভাবে।যতদিন চেয়েছিলাম ততদিন সফলতা পাই নি।হতাশ হয়ে যখন
ভেবেছিলাম আমার বোধহয় আর চাকরি পাওয়া হলো না, সেই বছরই চাকরি টা পেয়ে যাই আমি । এতদিন পর চাকরি পাবার
খবরে খুশি হয়েছিলেন মা -বাবা।চাকরি পাবার পর মনে হলো আমি একটা থই খুঁজে
পেলাম ।ছ মাস ট্রেনিং এর পর আমার ফার্স্ট পোস্টিং হয় বীরভূমের দুবরাজপুরে
।এখানের অফিসে কাজের চাপ কম।বেশিরভাগ দিন
বিকেলে গিয়ে বসে থাকি, মামা ভাগ্নে পাহাড়ে ।কোন কোন দিন
আমার সঙ্গী হয়, মণিশঙ্কর , আমার অফিসের স্টাফ। ও সঙ্গে থাকলে হেঁটে হেঁটে চলে যাই শালী
নদীর ধারে ।শালী নদী মনে পড়ায় শিলাবতীকে।ঘরে ফেরার টান অনুভব করি । বাবার
শরীর কদিন ধরেই ভালো যাচ্ছে না ।অসুস্থ বাবাকে নিয়ে অসহায় বোধ করেন মা।তাই মাঝে
মাঝে সিমলাপাল আসতে হয়। অলকানন্দাকে নিয়ে অসহায়তা অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে
বর্তমান শশব্যস্ত জীবন।বাড়ি ফিরলে মা বলেন , চাকরি তো হলো এবার বিয়ে কর।চাকরির পর বিয়ে মধ্যবিত্ত
জীবনের এটাই স্বাভাবিক নিয়ম ।হয়তো আমিও এর ব্যতিক্রমী হতে পারবো না ।তবুও মাকে বলি
'এই তো সবে চাকরি পেলাম মা, কটা দিন একটু থিতু হতে দাও ।'
-কিন্তু বয়স তো বাবা বসে থাকবে না ।এখন সমন্ধ আসছে, বয়স বেড়ে গেলে তখন আর ভালো সমন্ধ আসবে না ।
-তবুও মা কিছুদিন সময় দাও আমাকে।
সেবার বাড়ি থেকে দুবরাজপুরে ফিরছি।বাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে
আছি বাঁকুড়া বাইপাসে।গ্রীষ্মকালের দুপুর ।ফাঁকা রাস্তা ।রোদ থেকে বাঁচার জন্য কোন
দোকানে ঢুকবো ভাবছি।সামনের দিকে তাকিয়ে ঝলাৎ করে ওঠে আমার বুকের রক্ত ।সামনে বসে
অলকানন্দা ।'ঠিক দেখছি তো আমি?ভুলই বা হবে কী করে? এখনো যে ঐ চেহারা দিনরাত ছবির মতো ভেসে থাকে
আমার চোখে। ভাবি যাবো না ওদিকে , কিন্তু ওর তীব্র আকর্ষণ এড়াতে পারি না । গিয়ে দাঁড়াই ওর সামনে ।আমার
অস্তিত্ব টের পেয়েই বোধহয় বসে থাকা অলকানন্দা মুখ তুলে তাকায় ।ওর চোখে মুখে
বিস্ময়ের ভাব দৃষ্টি এড়ায় না আমার ।প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে অলকানন্দা
মৌনতা ভাঙ্গে 'তুমি ?'
-এখানে এইভাবে দেখা হবে আশা করোনি তাই তো ?
-হ্যাঁ।
-আমিও করিনি।কোথায় যাবে?
- দুর্গাপুর ।এখন তো আমরা ওখানেই থাকি।তুমি?
-দুবরাজপুর ।ওখানে পোস্টিং।আমি চাকরি পেয়েছি শোনোনি নিশ্চয়ই
।
-শুনেছি। অগ্নি বলছিল ।
-আমার চাকরি পাবার খবর ও জানে?
-হুম । সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন কারো সম্পর্কে খবর পাওয়া
কোন জটিল ব্যাপার নয়।
-ঠিক। বলি আমি।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আলকানন্দা বলে,
-তুমি অনেক বদলে গেছ অনুময়।
-তুমিও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছো বেশ।
আমার কথায় লাজুক হাসে অলকানন্দা ।আট বছরেও টাল খায়নি
সৌন্দর্য ।কথার তুলনায় নিরবতাতেই সময় কাটে বেশি।হয়তো ভাষার প্রতিবন্ধক হয়ে
দাঁড়াচ্ছিল অতীত স্মৃতি ।যাবার সময়ে ফোন নাম্বার নেয় আমার । আহ্বান 'জানায় একদিন এসো দুর্গাপুর অনেক কথা আছে।'
বাঁধ দেওয়া নদী গতি পেলে যেমন সব বাঁধা ছিন্ন করে
এগিয়ে যেতে চায় , আমাদের অবস্থাও হয়েছিল তেমনি। আমার ক্রমশ আগ্রহ বাড়ছিল নতুন
করে ফিরে পাওয়া অলকানন্দার প্রতি । ওর প্রশয় টানছিল ওর দিকে।সেই টানেই একদিন
ছুটে এসেছিলাম দুর্গাপুর ।দিন ভর শুনেছিলাম ওর দুঃখযাপন।বলেছিল 'বিশ্বাস করো অনুময় , আমি অগ্নিভকে বিয়ে করতে চাইনি।ও চাকুরীরত
দামী পাত্র তখন আমাদের সমাজে।তাই বাবা হাতছাড়া করতে
চান নি ওকে।আমি রাজী না হওয়াতে আত্মহত্যার হুমকি দেন।বাবার আত্মহত্যার
হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমার অন্য কোন উপায় ছিল না ।'
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে অলকানন্দা । ওর হাত আমার
হাতে তুলে নি , ভরসা দেবার ভঙ্গিতে ।ভরসা পেয়ে
বলতে থাকে, 'বিয়েটা আমার সুখের হয় নি।মা
হতে পারি নি আমি ।'
-ডাক্তার দেখাও নি?
-আমি দেখিয়েছি।ও ডাক্তারের কাছে যেতে রাজী নয়। আসলে নিজের
অক্ষমতা ধরা দিতে চায় না আমার কাছে ।ও দোষারোপ করে আমায়, বলে তোমার আমার মেলামেশার ফলে আমি নাকি. ..।অ্যাবরেশন
করিয়েছিলাম বলে আমি নাকি মা হতে পারছি না ।
-তুমি বলো নি আমাদের মেলামেশার সীমানা।
-বিশ্বাস করে না ।প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন করে
আমায়।
-বেরিয়ে আসছো না কেন?ডিভোর্স দাও নি কেন?
-ও ডিভোর্স দেবে না । আর ডিভোর্স দিয়ে যাবো কোথায়।বাবার
অবস্থা তো জানোই ।পড়াশোনাও তেমন করি নি যে এই বাজারে চাকরি পাবো।তাই আর
পাঁচজন গৃহবধূর মতো এই সব সয়েই টিকে যেতে চেয়েছি।
তবে আমি চাইনি এইভাবে টিকে থাক অলকানন্দা ।তাই
পরামর্শ দিয়েছিলাম 'তুমি ওই সম্পর্কটা ছেড়ে বেরিয়ে
এসো।'ভরসা দিয়ে বলে ছিলাম 'আমি গ্রহণ করবো তোমায়।'
কিছু করতে হলো না, সুযোগটা এসে গেল আচমকাই । একটা দুর্ঘটনা এনে দিল সুযোগটা
।বেনাচিতি থেকে বাইকে করে ফেরার সময়ে একটা চলন্ত লরির সঙ্গে মুখোমুখি
সংঘর্ষ হয় অগ্নিভর।আমাকে ফোন করে ছিল
অলকানন্দা ।দুবরাজপুর থেকে দুর্গাপুর পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায় আমার
।অলকানন্দার থমথমে চোখমুখ ভরসা পেয়েছিল আমাকে দেখে ।তবে সামলানো যাচ্ছিল না
অগ্নিভর মাকে । ওখান থেকে সিমলাপাল
পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে গেল । ওর শরীরটা যখন চিতায় তোলা হলো তখন রাত শেষের দিকে ।
শোকের মধ্যে আনন্দের একটা চোরা স্রোত বয়ে
যাচ্ছিল আমার মনে । এই আনন্দ অলকানন্দাকে পাবার আনন্দ ।
মোহনার কাছে এসে নদী যেমন শান্ত হয়ে আসে, লক্ষ্যে পৌঁছে আমি তেমনি ধীরে চলতে চাইছিলাম । জানি আমার
কাছে অলকানন্দার ফিরে আসতে আর কোন বাধা নেই ।তবুও আমি কিছু বলিনি এই
ব্যাপারে, যদিও বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে
আমাদের ।
কথাটা বললো অলকানন্দা ।হয়তো ওর প্রতি আমার ক্রমশ বাড়তে
থাকা আগ্রহ দেখেই। ' আমাদের এবার একটা সিদ্ধান্ত
নেওয়া দরকার অনুময় ।'
-আমিও তাই চাই ।
-আমি জানি তুমি কী চাও।তবে সেটা এখন আর সম্ভব নয়।
-কেন? আর্তনাদ বেরিয়ে আসে আমার গলার
স্বরে ।
-আমার শ্বাশুড়িকে এই অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে না
আমার।আর তা ছাড়া ভেবে দেখলাম আমার সঙ্গে দাম্পত্যের সম্পর্কে
ঢুকে তুমি অসুখী হলে তার দায় হবে আমার ।তার চেয়ে তুমি অন্য
কাউকে বিয়ে করে সুখী হও।নিরবতা নেমে আমাদের মধ্যে।একটু থেমে অলকানন্দা বলে আমার
মনে হয় এইভাবে আমাদের মেলামেশা আর ঠিক হবে না।
উঠে দাঁড়াই আমি ।ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসে চোখের সামনে
।লোডশেডিং।ঘুটঘুট্টে অন্ধকার ।
No comments:
Post a Comment