গদ্যঃ পার্থজিৎ চন্দ

প্রথম পর্ব

 বিরোধাভাসের ক্রমঃবিলয় – ‘সাতটি তারার তিমির’

 


একজন কবিকে যখন বারবার পাঠ-পরাপাঠের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং প্রতিটি পাঠের পর যখন ব্যক্তি-পাঠক এক নতুন গ্রন্থি-উন্মোচনের দিকে হেঁটে যান, তখন বুঝে যাওয়া যায় সেই কবি সমকালের গণ্ডিটিকে অতিক্রম করেছেন।

          অনেক সময় আগের পাঠ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না; তার শরীরে এসে জমতে থাকে বেশ কিছু নতুন মাত্রা একটা প্রিজমের মধ্য দিয়ে ছুটে যাওয়া আলো প্রতি মুহূর্তে সে-আলোর চরিত্র এবং প্রিজমদুটিই বদলে বদলে যাচ্ছে ফলে প্রতি মুহূর্তেই ম্যাজিক সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, এই ম্যাজিক কিন্তু কোনও সস্তা রাশিয়ান সার্কাসের নিচু-বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে না বরং এ-ম্য্যাজিক অনেকটাই মহাজাগতিক বিশাল ব্যাক-ড্রপের সামনে ঘটে চলা গূঢ় এক খেলা; যার দর্শক আমরা এবং দর্শকের ভূমিকা থেকে আমরাই হয়ে যাই সে-ম্যাজিকের ম্যাজিশিয়ান এই চলাচল চূড়ান্তভাবে আধুনিক মানুষের চলাচল এই যাতায়াতের মধ্যে ক্রমে ঘনিয়ে ওঠে এক টেনশন’ আধুনিক মানুষের ব্যক্তি-অবস্থান ও সমষ্টিগত অবস্থানের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা প্রায় দুষ্প্রবেশ্য জগতই আধুনিক মানুষের সব থেকে বড় অসহায়তা এই অসহায়তা থেকেই জন্ম নেয় তার যাবতীয় বিপন্নতা ও অবসন্নতা

          জীবনানন্দের কবিতায় স্বপ্নচারিতা পরাবাস্তবতা থেকে শুরু করে কালচেতনা পর্যন্ত যে একটা বিশাল মহাদেশতার অধিকাংশ যায়গা জুড়ে রয়েছে এক রিক্ততাবোধ এই রিক্ততাবোধের জন্ম ঐ ব্যক্তি ও সমষ্টির বোধের জায়গা থেকে।

‘সাতটি তারার তিমির’, আমার কাছে জীবনানন্দের ব্যক্তি ও সমষ্টির ধারণাগত সংঘাত।

          কিন্তু যেহেতু তিনি যে-কোনও ভাষার যে-কোনও সময়ের নিরিখেই একজন অতি-শক্তিশালী কবি এবং এক মহাচেতনার অধিকারী,  তিনি শুধুমাত্র যুক্তিবাদ ও জড়বাদের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। বরং এই দুটিকে ছাড়িয়ে যে মহাজীবন লগ্ন হয়ে আছে মহাজগতের গা’য়ে – তাকে দেখেতে পেয়েছিলেন।

          ‘সাতটি তারার তিমির’ আমাদের বারবার দেখিয়ে দেয় জীবনানন্দ ব্যক্তির চূড়ান্ত উপাসক। কিন্তু অন্য একটি পরিসরে, তিনি সমষ্টির বিকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ব্যক্তি-বিকাশের পথ ধরে অ্যনার্কিজিম ও সমষ্টির বিকাশের পথ ধরে ব্যক্তি মানুষের দমন – এই দু’ই পৃথিবীর বিপ্রতীপেই তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। যেহেতু তিনি ক্রান্তদর্শী, এই ‘টেনশনের’ মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আমাদের মধ্যে ক্রমশ জন্ম নেয়া ‘প্লাস্টিক বোধ’ ও ‘প্লাস্টিক মেধা’ আমাদের সব থেকে বড় সংকট। এই সংকট আমাদের চেতনার উপর ফেলে রাখবে এক ভারী কালো পাথর। প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে হেঁটে চলা ছাড়া আমাদের হয়তো আর কোনও পরিত্রাণ নেই।

পরিত্রাণ কি সত্যিই নেই? এক মহাচেতনার অধিকারী হওয়া ছাড়া এই জড়-জগতের আক্রমণকে প্রতিহত করবার কোনও উপায় নেই।

          এই মেটালিক ‘বোধ’ ও ‘জগত’টিকে প্রতিরোধ করতে জীবনানন্দ বেছে নিয়েছিলেন এক আর্দ্র চেতনার পৃথিবীকে। ‘সাতটি তারার তিমির’-এ তিনি তাই তছনছ করে দিয়েছিলেন কবিতার সব পূর্ব নির্ধারিত সংজ্ঞা‘আঁভা-গার্দ’ ধারণা চালিত যে আধুনিকতার চর্চা ইউরোপের দান, সেখান থেকেও বেরিয়ে এসেছিলেন জীবনানন্দ। কোথাও একটা যেন মনে হয়, তিনি এই পথটির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ফলে তিনি নিজেকে আঁভা-গার্দ প্রমাণ করতে সচেষ্ট হননি। বরং তিনি ভাষা ও সিনট্যাক্সের পূর্ব নির্ধারিত চরিত্র ভেঙে ফেলতে চেয়ে এমন একটা ভাষার আশ্রয় নিয়েছিলেন যে আপাতভাবে regressive।

          সেমিওটিকের দিক থেকে বিচার করলে, জীবনানন্দের ভাষা, বিশেষতসাতটি তারার তিমির’-এ এসে এক রত্নখনি হতে পারে

          ‘সাতটি তারার তিমির-এর কাছে বারবার ফিরে এসে বোঝা যায় ভাষার কাঠামো যেসাইননামক মৌল-উপাদানের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা কতোটা বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারে একজন মানুষের হাতে যেহেতু ভাষা দাঁড়িয়ে রয়েছে চিহ্ন ও সংকেতের উপর ভর করে সেহেতু ভাষা নিজেও বেশ কিছুটা চিহ্ন ও সংকেতলালিত এই দুটি দ্বারা সে শাসিতও বলা যেতে পারে কিন্তু আবার এটাও সত্য যে ভাষা শুধুমাত্র এটুকুই নয়

           ‘সাতটি তারার তিমির’-এ এসে তিনি ভাষার মহাদেশ জুড়ে থাকা জড় উপাদানগুলির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন বিদ্যুতগতিতে ফলে যেসব উড় উপাদানকে ডি-কোড করে আমরা ভাষার সিনট্যাক্স খুঁজে পেতে চাই, এই পর্বের জীবনানন্দের কবিতায় এসে তা অর্থহীন হয়ে ওঠে অনেকটা

          এই পর্বের জীবনানন্দের ক্ষেত্রে আরেকটি ব্যপারও মাথায় রাখা জরুরি লেখকটেক্সটপাঠক; এই বিন্যাস মেনে যে কাঠামো গড়ে ওঠে তার মধ্যে কোনও লিনিয়ার বাস্তবতা থাকতে পারে না অন্তত জীবনানন্দ সে বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন বলেই মনে হয়

          বেশির ভাগ কবির ক্ষেত্রে যেটি অভিশাপ সেটিকেই সব থেকে জোরালো করে তুলেছিলেনবিরোধাভাসে আক্রান্তকবি

          একবার একটি টেক্সটে বন্দি হয়ে গেলে; একবার এক সিন্ট্যাক্সের অংশ হয়ে গেলে  লেখকের ব্যক্তিভাষার যে মৌলচিহ্ন-সংকেত তাস্ট্রাকচারডও সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে বাধ্য কিন্তু জীবননানন্দ এখানেই চূড়ান্ত রকমের আলাদা অকল্পনীয় ভাবে পৃথক তিনি ভাষারপ্রতিমারূপটিকেগ্রহণকালেই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পূর্বধার্য অনেকঅ্যসোসিয়েটেডবা সংযুক্ত হয়ে থাকাচরিত্র তিনিই সব থেকে বেশি মুক্ত অঙ্গন বা ফ্রি-স্পেস দিয়েছিলেন ভাষার চিহ্ন ও সংকেতগুলিকে চলাচল করবার জন্য এই কারণেই জীবনানন্দের কবিতার দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ পাঠ আসলে তাঁর কবিতার পরাপাঠ যদি সেটি না হয়, তবে সমগ্র পাঠ প্রক্রিয়াটিই ব্যর্থ বলে গণ্য হতে বাধ্য

একটি ভাষারচরিত্রপ্রায় একার হাতে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অতিমানবিক কাজ সম্পন্ন হয়েছিলসাতটি তারার তিমির’-

          ‘সাতটি তারার তিমির’-এ পুণঃপ্রবেশ করবার শুভক্ষণে এটাও বলে রাখা জরুরি, জীবনানন্দের কালচেতনা ও সময়চেতনার মধ্যে একটা সুস্পষ্ট সীমারেখা দেখতে পাওয়া যায় এই কাব্যগ্রন্থে অনেকেই এ-দুটিকে এক প্যারামিটারে বিচার করে থাকেন অবধারিত ভাবে তাদের কাছে জীবনানন্দ খণ্ডিত আকারে ধরা দেনসাতটি তারার তিমিরপড়তে পড়তে বারবার মনে হয়, সময় কীভাবে কালের গর্ভে ঢুকে যায় সেটি অনুভব করতে পেরেছিলেন জীবনানন্দ

          এটুকু বললেও সবটা ধরা যায় না কারণ কাল নিজেই নিজেকে প্রসারিত করে চলেছে অবিরাম সময়চেতনার মধ্যে থেকে, তাকে লালন করে সেই কালচেতনার হদিশ পাওয়া সম্ভব নয় সময়চেতনাকে ছাড়িয়ে উঠে, এক স্ফূরণের মধ্য দিয়ে তাকে ছোঁয়া যেতে পারে

          জীবনানন্দ এই দুটির মধ্যেই চলাচল করেছিলেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে সময়চেতনাকে অতিক্রম করে কালচেতনাকে ছুঁতে চেয়েছেন কোনও প্যারাডক্সের ছায়া পড়ে নেই এখানে। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সময়ের বারান্দা পেরিয়েই কালের অলিন্দে যেতে হয়।

          ‘সাতটি তারার তিমির’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি লেখা হয়েছিল ১৯২৮ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে। এই পনেরো বছর এই কাব্যগ্রন্থের রচনাকাল। বহুরৈখিক স্বর-সমৃদ্ধ এই কাব্যগ্রন্থটি, অতএব, ধরে নেওয়া যায়, জীবনানন্দকে সব থেকে সার্থকভাবে উপস্থাপিত করে।

এই কাব্যগ্রন্থের ‘ঘোড়া’ কবিতাটি নিয়ে বিখ্যাত সব সমালোচনা রয়েছে বাংলায়। কবিতাটি শুরুই হচ্ছে স্টেটমেন্ট-ধর্মী একটি লাইন দিয়ে, ‘আমরা যাইনি ম’রে আজো – তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়;।’

          এই লাইনটি পাঠককে এক প্যারাডক্সের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই লাইনটির ভেতর ডুব দিলে একটি সম্ভাবনা ফুটে ওঠে। তাহলে কি আমাদের মৃত্যুর পর এইসব দৃশ্যের জন্ম নেওয়া আরও সাবলীল হতে পারত? এই কবিতাটির সব থেকে ঘাতক শব্দ ‘তবু’। কোথাও গিয়ে মনে হয়, যাপিত জীবনের ‘সময়’ ছাড়িয়ে তাহলে জীবনের পরে রয়ে যাওয়া এক ‘কালের’ দিকে কবি ইঙ্গিত করছেন। জীবনকে ঘিরে রাখা যে সময়প্রবাহ, সেটিও যেন তুচ্ছ হয়ে আসছে এক আবহমানের সামনে এসে।

এই কবিতাটির প্রেক্ষিতে টি এস এলিয়টের বিখ্যাত ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর একটি অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। এলিয়ট লিখছেন,

Time present and time past

Are both perhaps present in time future,

And time future contained in time past

It all time is eternally present

All time is unredeemable.

What might have been is an abstraction

Remaining a perpetual possibility

Only in a world of speculation’ 

এখানে এসে জীবনানন্দের সঙ্গে টি এস এলিয়টের সময়-জগত একটি বিন্দুতে মিশে যেতে চান

          এই কবিতাটিতে জীবনানন্দ বারবার আস্তাবল ও ঘোড়াদের কথা বলেছেন কোন ঘোড়া? প্রস্তরযুগের ঘোড়া সব বলেছেন পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর কথাও এবং বলেছেন ইস্পাতের কলে ঝরে পড়া বিষণ্ন খড়ের শব্দের কথাও

          বেশ কয়েকটি ইন্টারপ্রিটেশন উঠে আসতে পারে এখান থেকে

          আস্তাবল ও ঘোড়া অবধারিতভাবে শক্তিশালি পুরুষ যৌনতার প্রতীক ঠিক উলটো দিকে তিনি স্থাপণ করেছেন বিষণ্ন খড়ের ঝরে পড়বার চিত্র যে অনেকাংশেইফেমিনাইনএক ঝলকে, ঐ ইস্পাতের কলে খড়ের কর্তিত হয়ে যাওয়াটিকে একটি যৌনচিত্র বলে মনে হয় কিন্তু এই লাইনটিতে কবি ঠেসে দিয়েছেন বিষণ্ননামে একটি বিশেষণ বিষণ্ন যৌনতার ধারণা কালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কল্পণা করা বেশ কঠিন এখানে উঠে আসে আরেকটি ব্যখ্যা কবি কি তাহলে এখানে, ঠিক এই একটি শব্দের মধ্য দিয়ে, অবিরাম যৌনক্লান্তির কথা বলে গেলেন?

          জীবনানন্দের অপরাপর লেখার দিকে তাকিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এই যৌনক্লান্তির উল্লেখ সুপ্রচুর

          আরকটি ইন্টারপ্রিটেশনও উঠে আসা কঠিন নয় খড় ও ইস্পাত এই দুটি শব্দ যথাক্রমে কৃষিভিত্তিক সভ্যতা ও যন্ত্রসভ্যতাকে সূচিত করেছে যন্ত্রসভ্যতার আগ্রাসণের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করছে কৃষিভিত্তিক সভ্যতা; এবং সে কারণেই একটি বিষণ্ন সুর ছেয়ে রয়েছে সমগ্র প্রক্রিয়াটির উপর

 কবিতাটির একদম শেষ লাইনে নিওলিথ স্তব্ধতার কাছে আমাদের স্তব্ধ হয়ে যেতে হয় এই স্তব্ধতা আসলে ১২০০০ বছর আগের এক স্তব্ধতা

          সম্প্রতি Yuval Noah Harari তাঁর Sapiens – A Brief History of Humankind গ্রন্থে ঠিক এই ধরণের এক স্তব্ধতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন নোহা হারারি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই সময়ের আশেপাশেই পৃথিবীতে ঘটে গিয়েছিল ইতিহাসের সব থেকে বড় annihilation অন্য সমস্তহোমো স্পিজিসদের মুছে দিয়ে পৃথিবীর একছত্র সম্রাট হয়ে উঠেছিল হোমো স্যাপিয়েন্স অবলুপ্তির দিকে চলে গিয়েছিল অন্য সব হোমো-স্পিজিস

          শুধু তাই নয়, কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা শুরু হবার ফলে মানুষের domestication শুরু হয়েছিল অর্থাৎ যাযাবর মানুষ নিজেই নিজেকে বন্দি করে ফেলেছিল একটি গণ্ডির মধ্যে সময়-চালচিত্রের একটা ফ্রেম সরে গিয়ে জায়গা করে দিচ্ছিল আরেকটি ফ্রেমকে

          এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই সন্ধিক্ষণে, ছায়া পড়েছিল এক ভয়াবহ স্তব্ধতার

          জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘প্যারাফিন-লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলেসময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;

          আরও বহু দুমাত্রার শব্দ থাকা স্বত্তেও জীবনানন্দ বেছে বেছে কেনগোলশব্দটিই ব্যবহার করলেন তার ব্যখ্যা অনঙ্গ অন্ধকারে ঢাকা অনেকে মনে করেন কবিত্বসুলভ ঝোঁকের বশে এই ধরণের শব্দের ব্যবহার হয়ে থাকে এই ব্যখ্যা মেনে নেওয়া কঠিন বিশেষ করে আস্তাবল ও গোলএই ধারণা দুটি কোনও ভাবেই সংযুক্ত বা associated নয় যখন

          গোল, অর্থাৎ বৃত্ত সব থেকে নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতি। ইতিহাসের রিপিটেশনকে সূচিত করবার পক্ষে এই বৃত্তাকার সব থেকে উপযোগী।

          কবিতাটি যতবার পড়েছি ততবার এক একটি মাত্রা যুক্ত হয়ে গেছে তার সঙ্গে। একটা সময় মনে হতো, ইতিহাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে রণ-রক্ত-সফলতা, তার উলটো দিকে সম্পূর্ণ স্থির ভাবে রয়ে গেছে প্রশান্তিমাখা সময়। সে তলিয়ে যাচ্ছে কালের গভীরে। সম্প্রতি এই কবিতাটি পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে স্টিফেন হকিং যে psychological arrow of time-এর কথা বলেছেন, সেই তিরটিকে যেন ছুঁয়ে ফেলেছিলেন জীবনানন্দ

          জীবনানন্দের কবিতায় ইতিহাসচেতনা সময়চেতনা ইত্যাদি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন দিকে থেকে আলো ফেলেছেন প্রখ্যাত সমালোচকরা কিন্তু তাঁর মনন কতখানি বিদীর্ণ হয়েছিল দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ সংক্রান্ত প্রশ্নে, সেদিকে খুব কমই আলো ফেলা হয়েছে বস্তুবাদের প্রাথমিক শর্তগুলি হৃদয়ঙ্গম করে তিনি তাকে অতিক্রম করে যেতে চেয়েছিলেন। এই বিষয়টি পৃথক এক ইজম বা মতবাদের জন্ম দিতে পারে।

তাঁর বিখ্যাত ‘সময়ের কাছে’ কবিতায়, যে কবিতাটি শুরু হচ্ছে সেই বিখ্যাত লাইনটি দিয়ে, ‘সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিতে চ’লে যেতে হবে/ কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি।’, তিনি বলছেন,

‘যারা সব পেয়ে গেছে তাদের উচ্ছিষ্ট,

যারা কিছু পায় নাই তাদের জঞ্জাল;

আমি এইসব।’

-কিন্তু কবির দ্বন্দ সব থেকে প্রকট হয়ে উঠতে দেখা যায়, যখন তিনি বলেন,

‘নচিকেতা জরাথ্রুষ্ট লাওৎ-সে এঞ্জেলো রুশো লেনিনের মনের পৃথিবী

হানা দিয়ে আমাদের স্মরণীয় শতক এনেছে?’

-এই  প্রশ্নসূচক উচ্চারণের শেষে যে উত্তর আমাদের স্বাভাবিকভাবেই মনে এসে যায় তা হলো, সেই শতক তাঁরা আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। বলা যেতে পারে, বহুদূর অগ্রসর হয়েও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। বস্তুবাদের সেই যে বিখ্যাত স্তম্ভ বা পিলার, ‘দ্বন্দ ও সংঘর্ষ ছাড়া অগ্রগতি নেই’, প্রায় সে-সুরেই জীবনানন্দ বলে ওঠেন, ‘কোথাও আঘাত ছাড়া – তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই।’

          ‘সাতটি তারার তিমির’-এর সব থেকে পরিচিত কবিতা সম্ভবত ‘আকাশলীনা’। কবিতাটির মধ্যে যে টানাপোড়েন সেটাই বারবার টেনে নিয়ে আসে পাঠককে।

          কবিতাটিতে স্পষ্ট, কবি সুরঞ্জনা নামের মেয়েটিকে অন্য যুবকের সঙ্গে কথা বলতে বারণ করছেন। কিন্তু সেই নারী ইতিমধ্যেই বেশ কিছুদূর হেঁটে ফেলেছে যুবকটির সঙ্গে। সেখান থেকে তাকে ফিরে আসবার আহ্বান জানাচ্ছেন কবি। কোন বাস্তবতায় আহ্বান জানাচ্ছেন? ‘নক্ষত্রের রূপালী আগুন ভরা রাতে;’।

এই স্পষ্ট যৌন-ইশারার মধ্য দিয়ে কবি ইঙ্গিত দেন, উক্ত যুবকের মতো তাঁরও শরীরি আবেদন বেঁচে আছে কিছু।

          দ্বিতীয় স্তবকে এসে সে-নারীকে যুবকের সঙ্গে আরও বেশি দূরে যেতে নিষেধ করছেন তিনি। অর্থাৎ,যেটুকু সর্বনাশ ঘটে গিয়েছে সেটুকুকে মেনে নিতে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু আরও বেশি সর্বনাশ থেকে তাকে নিবৃত্ত করতে তিনি বদ্ধপরিকর।

তৃতীয় স্তবকে সে-যুবকের প্রেমকে কবি ঘাস হিসাবে দেখেছেন, ‘মৃত্তিকার মতো তুমি আজ ঃ/ তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে’। যেহেতু সুরঞ্জনা মৃত্তিকার ভূমিকায়, সেহেতু ধরেই নেওয়া যায় সে সেই ঘাসের মতো প্রেমকে পুষ্টতা দিয়ে চলেছে।

          এখান পর্যন্ত কবিতাটির একটি  প্রেমের কবিতা। কিন্তু সেটিই অসামান্য হয়ে উঠেছে শেষ স্তবকে এসে। এখানে কবি সুরঞ্জনার হৃদয়কে ঘাস হিসাবে চিহ্নিত করলেন। এবং তৃতীয় স্তবকে যা ছিল, ‘আকাশের আড়ালে আকাশে’ তা চতুর্থ স্তবকে এসে হয়ে উঠল, ‘আকাশের ওপারে আকাশ

          ঠিক এই জায়গাটিতে এসে মনে হয় কবি impending danger-টিকে, অনাগত বিপদটিকে প্রতিহত করতে পারেননি

          এই কবিতাটির শেষ স্তবকটিকে আমার মনে হয় এক ক্যাথারসিসের ক্ষণ, একটি রিলিফ মুহূর্ত

*ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

No comments:

Post a Comment

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, কণাদ ...