ম্যাজিক অফ লিভিং
সাতদিন ধরে তোলপাড় চলছে চ্যাটুজ্জ্যে বাড়িতে।আড়াইতলা বাড়ির আগাপাশতলা ঝাড়পোঁছ করে ডানদিকের খাট বাঁদিক -পূবদিকের টেবল পশ্চিম দিক করে,পর্দা পাল্টে পাপোষ উল্টে তিন তিনজন কাজের লোক নিয়ে এই হুড়-মাটি-চূড়ের কর্মযজ্ঞ যিনি সামলাচ্ছেন তিনি নন্দিনী চ্যাটার্জ্জী, এই বাড়ির গিন্নি, উপলক্ষ্য একমাত্র পুত্রের বাড়ি আসা।ছেলে বাড়ি আসছে এতে এতো মাথা খারাপ করা কর্মকাণ্ডের কি আছে? ছেলের বাবার মতো এমনটি যারা ভাবছেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই - এ ছেলে যে সে ছেলে নয় - এই আসাও যেমন তেমন আসা নয়।সেই কবে ক্লাস ফাইভে পড়তে ঘর ছেড়ে মিশনের হষ্টেলে গেছিল অনির্বাণ ওরফে টোটন, সেখান থেকে মাধ্যমিক,উচ্চমাধ্যমিক এ র্যাঙ্ক করে যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তারপর আহমেদাবাদে এম.বি.এ করে কর্পোরেট চাকরির সুবাদে পাঁচবছরের বিদেশ বাস শেষে আপাতত ব্যাঙ্গালুরুতে থিতু হওয়া। এরমধ্যে ছুটিছাটায় বাড়ি আসা ছাড়া একবারই দিন দশেকের জন্য এসেছে বিয়ে করতে।অফিস কলিগ অভিষিক্তা ব্যানার্জ্জীর সঙ্গে বিয়েটা টোটন নিজে ঠিক করলেও নন্দিনী সেকথা পাঁচকান হতে দেয় নি।জাত-কুল-মান সব মিলিয়ে প্রেম করেছে ছেলে শুধুমুধু আত্মীয় স্বজনের কাছে প্রেমের কথা ফাঁস করে ছেলের চরিত্তিরে চোনা ঢালার মতো বেয়াক্কেলে মা নন্দিনী মোটেই না,উল্টে ছেলের সঙ্গে ষড় করে প্রেমের কথা কর্তাকেও লুকিয়েছেন।যা হ্যালবেলে লোক সঙ্গে সঙ্গে তুতোখুতো সব ভাই বোনদের ফোন করে ঢাক পিটিয়ে ছেলের প্রেমের গপ্পো ফাঁদবে - মাঝখান থেকে এতবছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা ছেলের ইমেজের দফারফা করে ছাড়বে।যতোই হোক নিজের ছেলে আর পরের ছেলের তফাত থাকবে না?তাই তো কর্তাকে দিয়ে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিইয়ে এই মেয়ে নির্বাচন অবধি যে পুরোটাই সুচতুর পরিকল্পনা তা অমলকান্তি চ্যাটুজ্জের মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেছে।সরল সাধাসিধে অমলকান্তির মনে একবারটিও প্রশ্ন জাগে নি শ'পাঁচেক চিঠির মধ্যে একমাত্র চন্দননগরের অভিষিক্তার বাড়ির চিঠিটিই কেন খোলা হল!সেই বিয়ের পরও তিন বছর কেটে গেছে ছেলে - বৌ এর চাকরির চরম ব্যস্ততার কারণে ওরাও আসেনি এরাও যায়নি।ভাগ্যিস চীনেরা ছাইপাঁশ গিলে করোনা এনেছিল তাই তো নন্দিনীর কপালে শিকে ছিঁড়লো।এখন 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম'এর দৌলতে ছেলে বৌ এর সঙ্গে এক ছাদের তলায় সংসার করার সুযোগ হলো।প্রস্তাবটা টোটনেরই দেওয়া।বাড়ি থেকেই যখন দুজনের কাজ চলছে তখন নিজেদের বাড়ি থেকে নয় কেন?খামোখা মাসে মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়াও তো বাঁচবে।নন্দিনী তো শোনা মাত্র লাফিয়ে উঠেছে,এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছে নৈলে নন্দিনী কবে আর স্বামী -পুত্র নিয়ে ভরপুর সংসারের স্বাদ পেলো?কর্তা ও.এন.জি.সি র চাকরি নিয়ে সারাজীবন একবার আসাম তো একবার মহারাষ্ট্র চষে বেরিয়েছে, একা নন্দিনী এই পাটুলির বাড়িতে শ্বশুর -শাশুড়ির সেবা করে কাল কাটিয়েছে।ছেলেকে রামকৃষ্ণ মিশনের হস্টেলে দেবার বুদ্ধিও নন্দিনীরই।নৈলে দাদু- ঠাকুমার আহ্লাদে গোল্লায় যেতো না ছেলে?বাপ তো জন্ম দিয়েই খালাস, সবরকম আঁচ-ছোয়াঁচ বাঁচিয়ে ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করলো টা কে?
ছেলে বৌ আমিষ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে ফোনে শুনলেও নন্দিনী
ধর্তব্যের মধ্যে আনে নি।বাঙালীর ছেলে মাছ খাবে না হয়?তাও আবার টোটন?ছুটি ছাটায় বাড়ি এলে পাঁঠার নলি খাবার জন্য নোড়া নিয়ে বসতো!ব্যাঙ্গালোরে মায়ের
হাতের সর্ষে ইলিশই বা কোথায় পাবি,চিঙড়ির মালাইকারিই বা কে রেঁধে
দেবে বাবা?রোজগেরে গিন্নি কি আর একটামাত্র
ছুটির দিনে বেলা অবধি না ঘুমিয়ে আলু দিয়ে লাল লাল পাঁঠার ঝোল রাঁধবে?বাড়ি আয় দেখছি কেমন নিরামিষ খাস।কোথাকার সোমশঙ্কর না
মঙ্গলশঙ্কর বাবাজীর - 'magic of living'- এর দলে ভিড়ে এই সব শুরু করেছিস,তুই কি বৌ সমেত সাধু হবি নাকি?
কিন্তু ব্যাপারটা যতো সহজ ভেবেছিল ততটাও নয়।আজ তিনদিন হলো
টোটনরা এসেছে।ছেলে বৌকে কাছে পাওয়ার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস থিতিয়ে এখন আস্তে আস্তে
নন্দিনী সমে ফিরছে।এই তিনদিনই কলকাতার এক বিখ্যাত
নিরামিষ হোটেল থেকে হোম ডেলিভারি এনে খেয়েছে দুজনে।বেডরুমে ইলেকট্রিক
কেটলিতে চা করেছে।কুড়ি লিটারের জলের জার এনে দোতলার হলে রেখেছে কেননা নন্দিনীর
জলের ফিল্টার মেসিন রান্নাঘরে ফিট করা - রান্নাঘরে আমিষ হয় কাজেই ও জল অচ্ছুত।
আজ সকাল থেকে রান্নাঘরের শুদ্ধিকরণ যজ্ঞে মেতেছে
নন্দিনী।পুরোনো কৌটোবাটা পাল্টে বাসন কোষন ধুয়ে,লোক ডেকে চিমনি থেকে ফিল্টার সব পরিষ্কার করে রান্নাঘরকে
পবিত্র করতে হবে -একি চাট্টিখানি কথা?শান্ত শিষ্ট অমলকান্তি একবার বলতে চেয়েছিলেন দোতলার রান্নাঘরে ছেলে বৌয়ের আলাদা
ব্যবস্হা করে দিতে নন্দিনীর আগুনে চোখের দিকে তাকিয়ে আর কথা শেষ করতে পারেন
নি।তিরিশ বছরের পুরোনো অলউইন ফ্রিজ ছ্যাঁচড়াতে ছ্যঁাচড়াতে টেনে নিয়ে গিয়ে সিড়ির
নিচে জড়ো করা হলো।ধোঁয়াটে চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন অমলকান্তি।সব কিছু ধুঁয়ে শুদ্ধ
হলো -ফ্রিজটি কেবল বদলে গেল। তারবদলে এলো দু পাল্লার ফ্রস্ট ফ্রি পেল্লায় ফ্রিজ
যাতে মাছ - মাংস - ডিমের প্রবেশ নিষেধ।হতবাক অমলকান্তি ভেবেই পেলো না তাহলে ফ্রিজে
থাকবে টা কি!
নন্দিনীর সংসার ছন্দে ফিরেছে আর বাইরে থেকে নিরামিষ খাবার
আসে না।এরমধ্যে দুর্গাপুজো এলো।নবমীর দিন মাংসের দোকানে লাইন দেওয়া অমলকান্তি
নিষ্ঠাভরে ন'দিন ধরে নবরাত্রি পালন করলেন।সকাল
থেকে নন্দিনী একে একে নিরামিষ জলখাবার,দুপুরে নিরামিষ পদ রান্না করে।ঘরের বাতাস হিঙ - ঘি -অড়হড়
ডালের গন্ধে ভারি হয়ে থাকে।সারাদিন ছেলে - বৌ ল্যাপটপের সামনে বসে অফিস
করে।সপ্তাহে তিন চারদিন করে দুজনেরই মিটিং থাকে।ইউ.এস.এ বেসড কোম্পানি হওয়ায়
মধ্যরাত গড়িয়ে যায় মিটিং শেষ হতে।যতক্ষণ মিটিং চলে বাড়িতে অলিখিত জরুরি অবস্থা
জারি থাকে,কথা বলা,টিভি দেখা তো দূরের কথা কাশি পেলেও ছাদে চলে যেতে হয়
নন্দিনীদের।অমন সারাদিন হৈহৈ করা নন্দিনী দিনদিন কেমন ঝিমিয়ে যাচ্ছে যেন।চুপচাপ
অমলকান্তিও চুপসে গেছেন আরো।নন্দিনীর চোখের কোলে গভীরতর কালির পোচ দেখতে দেখতে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমলকান্তি - 'তোমার খুব চাপ হয়ে যাচ্ছে না?মাছ ছাড়া তো একবেলা ভাত রোচে না তোমার!' ম্লান মুখে নন্দিনী বলে - 'আমার কেন জানি না -
কিচ্ছু হজম হচ্ছে না,সবসময় গলার কাছটা আটকা আটকা লাগে,সব সময় পায়খানা পায়
অথচ পেট পরিষ্কার হয় না,খুব শরীর খারাপ লাগে।' পরদিন নন্দিনী কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটলেন
অমলকান্তি।একগাদা টেস্টিং বারকয়েক ডাক্তারখানা ছোটাছুটির পর জানা গেল CHRONIC
COLITIS যার গাল ভরা নাম INFLAMMATORY
BOWEL DISEASE.ডাক্তার নিদান দিলেন কোনও শাকসব্জী
তরকারি চলবে না।ছোটমাছের পাতলা ঝোল আর ভাত একমাত্র পথ্য।
ডাক্তারখানা থেকে ফিরে অমলকান্তি টোটনকে ডেকে বলতেই হাসির
রোল পরে গেল ছেলে বৌ এর -'আচ্ছা বাবা যারা নিরামিষ খায় তাদের
এসব রোগ হলে কি খাবে ডাক্তার কে জিজ্ঞাসা করেছিলে?তোমাদের মাছ না হলে চলে না - মাছ খাও,এসব হাস্যকর অজুহাতের কি দরকার?বয়স হলে তো মানুষের খাওয়াদাওয়ার ঝোঁক কমে আসে জানতাম -তোমরা
তো অবাক করলে!'
আজ চারমাস পর নন্দিনী আর অমলকান্তি কালো জিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে চারাপোনার পাতলা ঝোল আর গরম ভাত খেতে বসেছেন। মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে কাঁটা বাছছেন অমলকান্তি সেদিকে তাকিয়ে নন্দিনীর মনে হলো ভাগ্যিস এই পরের ছেলেটা সেদিন স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে সব অসভ্যতার বিরুদ্ধে রুখে উঠেছিলো নৈল নিজের ছেলের হাত থেকে তাকে বাঁচাতো কে?
No comments:
Post a Comment