গরুতে খেয়ে গেছে কাশফুলঃ বছরভর অপেক্ষা সত্যজিতের
শুরুরদিকে বেশ
ভুগিয়েছিল অপু-দুর্গার পোষা কুকুর ভুলো। বোড়াল গ্রাম থেকেই জোগার করা কুকুরটার গায়ের রঙ ছিল বাদামি আর লেজের ডগা সাদা। বাড়ির দাওয়ায় বসে সর্বজয়া
অপুকে ভাত খাওয়াচ্ছেন, ভুলো উঠোনে বসে খাওয়া দেখছে। অপুর মন তীর ধনুকের দিকে। খেতে খেতেই তীর ছোঁড়ে
অপু, কুড়িয়ে আনতে ছোটে উঠোনের
অপর প্রান্তে সর্বজয়াও ছোটে ভাতের থালা হাতে। ভুলোও তাকিয়ে থাকে ভাতের থালার দিকে। চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে থালার
অবশিষ্টাংশ সর্বজয়া ছুঁড়ে দিলে তা ভুলোর পেটে যায়। দৃশ্যপটের এই অংশ বেশ
ভালভাবেই তোলা হয়েছিল। আলোর অভাবে সেদিনকার জন্য কাজ শেষ করতে হয়। টাকার অভাবে পরবর্তী
অংশের কাজ ছমাস আটকে যায়। ছমাস পরে টাকা জোগার হলেও চিন্তায় ফেলে দেয় ভুলো। এই ছমাসে সে মারা গেছে। পরে ওই রকমই দেখতে একটা
কুকুর কে দিয়ে কাজ চালানো হয়। এই ভুলোও আবার বিপত্তি বাঁধায়। পুকুরের ওপাশে চিনিবাস
ময়রা দাঁড়িয়ে আছে আর এপারে তার মিষ্টির পানে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অপু, দুর্গা। ময়রা মিষ্টির প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে দুর্গা ‘না’ জানিয়ে ভাইকে ‘চ’ বলে দৌড়
লাগালে পিছু পিছু ছুটবে ভুলো। কিন্তু আসল সময়ে বাগরা দিল সে। কিছুতেই ছোটে না। এদিকে মহার্ঘ ফিল্ম নষ্ট হচ্ছে। পরে অবশ্য কুকুরের মালিককে ছুটিয়ে ভুলোকে
ছোটানো গেছিল।
এ তো গেল
কুকুর, গরুও যে পরোক্ষভাবে ‘পথের পাঁচালি’র অন্যতম আকর্ষনীয় দৃশ্য গ্রহণের প্রতিবন্ধক হবে তা ভাবতে
পারেননি সত্যজিৎ। কীভাবে? চলুন দেখা যাক। ভূবনডাঙার মাঠ তারপর ধানক্ষেত তারপরেই রেল লাইন। বাছুরটাকে
খুঁজতে গিয়ে দুই ভাইবোন হারিয়ে যায়। দীর্ঘপথ পেরিয়ে জলা আর কাশের জঙ্গল ঠেলে তারা
প্রথমে আবিষ্কার করে ধাতব পিলার,সেই টেলিগ্রাফ পোষ্টে কান পেতে তারা দুর্বোধ্য গোঁ
গোঁ শব্দ শুনতে পায়। কাশের নিচে বসে দুর্গা তার
কাপড়ে চোরকাঁটা তুলছে, একখন্ড আখ অপুকে দিয়ে দুর্গা বলে ‘খা - না’। ভয় মেশানো গলায় মায়ের
বকাঝকার কথা মনে করিয়ে দিতে গেলে অপুর মুখ টিপে ধরে দুর্গা। রেলগাড়ির আওয়াজ অনুভব
করে সে। কু-ঝিক-ঝিক শব্দের অভিমুখে ছুটতে থাকে তারা। ধোঁয়া উড়িয়ে সিটি বাজিয়ে ছুটে যায় ট্রেন।
অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে অপু। এই অপু দুর্গার রেলগাড়ি দেখতে ছুটে চলার দৃশ্য বাঙালির
মনে কয়েক দশক ধরে আঁকা আছে। ভারতীয় রেলের এক স্মরণীয় ছবিও এটা। পুজোর থিম থেকে
বাড়ির দেওয়াল অথবা পূর্বরেলের কোনো কোনো প্লাটফর্মের
দেওয়াল চিত্র থেকে শারদ সংখ্যার প্রচ্ছদ সব ক্ষেত্রেই ছবিটিকে ব্যবহার করা হয়। এই
ভূবনজয়ী দৃশ্যটির শুটিং হয়েছিল কলকাতা থেকে সত্তর মাইল দূরে বর্ধমানের কাছে পালসিট
গ্রামে। বর্ধমান হাওড়া রেলরুটে শক্তিগড়-এর পরই একটি ছোট স্টেশন পালসিট। এই স্টেশনের
গা দিয়েই চলে গেছে জাতীয় সড়ক। এরপরই বড় ফাঁকা মাঠ। আশপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচু ভূ - ভাগ এই জায়গাটি।
১৯৪৩ এ দামোদরের বড় বন্যায় এই এলাকায় রেললাইন ও জাতীয় সড়ক
ভেঙে যায়। বালির স্তর পড়ে অনুচ্চ কিছু
ভূমিরূপ গড়ে ওঠে। বালি সরিয়ে চাষযোগ্য করা সম্ভব ছিল না। তাই সে মাঠ অনাবাদিই থাকত। এই বিস্তীর্ণ এলাকা
জুড়ে শরৎকালে ফুটে উঠতো কাশফুল। জাতীয় সড়ক ও রেলপথ লাগোয়া বলে দূরযাত্রীদেরও নজর
কাড়তো। সেই ভাবেই সত্যজিতের চোখে পড়েছিল। ছোট অপু দুর্গা সহ শুটিং এর পুরো টিম
নিয়ে সত্যজিৎ রায় হাজির হয়ে যান এই
জায়গায়। দিনটা ছিল জগদ্ধাত্রি পুজোর দিন। একটা বড় দৃশ্যের শট নিতে হবে। একদিনের
কাজ নয়,অন্তত দুদিন লাগবে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলল শুটিং এর কাজ। ছোট অপু
অর্থাৎ সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়, দুর্গা চরিত্রে উমা দাশগুপ্ত, ক্যামেরা ম্যান সুব্রত
মিত্র প্রমুখের প্রবল উৎসাহে প্রথম পর্বের কাজ সেরে তাঁরা কলকাতায় ফিরে যান। দিন
সাতেক পরে আবার সেই লোকেশনে এসে সত্যজিৎ রায় হতবাক। সেই মাঠকে আর চেনাই যায়। কোথায়
সেই কাশফুল ? শুধু ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ। পরে স্থানীয় মানুষদের কাছে জানতে পারেন এই কাশফুল নাকি গরুর
খাদ্য। এই সাতদিনে তারা তা সাবার করে দিয়েছে। প্রায় একবছর অপেক্ষা করে এই পর্যায়ের
দ্বিতীয় পর্বের শুটিং শেষ করেন। দ্বিতীয় পর্বে ছিল মূলত ট্রেনের শট। একই দিক থেকে আসা পর
পর তিনটে ট্রেনকে ব্যবহার করা হয়েছিল। সত্যজিৎ রায় লিখেছেন ‘যে স্টশন থেকে ট্রেন আসবে সেখানে আমাদের দলের অনিলবাবুকে
রাখা হয়েছিল। ট্রেন এলে অনিলবাবু উঠে পড়তেন ড্রাইভারের সঙ্গে। কারণ গাড়ি শুটিং এর
জায়গার কাছাকাছি এলেই বয়লারে কয়লা দেওয়া দরকার,তা না হলে কালো ধোঁয়া বেরোবে না। সাদা কাশফুলের পাশে
কালো ধোঁয়া না পেলে দৃশ্য জমবে কেন’?
বর্তমানে জায়গাটা
দেখলে চিনতেই পারা যাবে না এই জায়গাতেই জন্ম নিয়েছিল অপূর্ব সেই দৃশ্যপটটি। সেখানে
তৈরি হয়েছে জাতীয় সড়ক কতৃপক্ষের একটা বড়
গোডাউন। আর আশপাশে গড়ে উঠেছে একটা ছোট
জনপদ। সেই জনপদে লেগেছে গঞ্জের ছোঁয়া। এতগুল বছরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বড় বড়
বনস্পতি। বালি সরিয়ে কিছু জমিকে আবাদি করা
গেছে, সেখানে চাষাবাদ হয়। মধ্যষাটের এক
অবসরপ্রাপ্ত মাষ্টারমশাই বিধান মন্ডল জানালেন
‘এই জায়গার গরিমা আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না। আমরাও দেখিনি কিন্তু শুনেছি।
ছবি দেখি আর কল্পনায় মিলিয়ে নিই, আর গর্বিত হই।’ কাশের জায়গার দখল নিয়েছে
কংক্রিটের আস্তরণ। এখনও ফি বছর কাশ ফোটে তবে তখনকার মত নয়। ইতস্তত আলের ধারে।
সারাদিনে ক্ষণে ক্ষণে ইলেকট্রিকের ট্রেনের যাতায়াত। নতুন কোনো আশ্চর্যের জন্ম হয়
না, আক্ষেপ এলাকাবাসীর।
সহায়ক গ্রন্থঃ

No comments:
Post a Comment