শকুনির নাচ
গাজনের মেলা থেকে ফিরে যাচ্ছি অন্ধকারে একাকী ঘরের দিকে;
মনে হচ্ছে সময়ের চারপাশে ঘুরে
বেড়াচ্ছে অজস্র রং মেখে সং সাজা মুখ, তারা কেউ শ্যামাকালী
কেউ বা কালভৈরব ছিন্নমস্তা ডাকিনীযোগিনী শনি
শেয়াল কুকুর কাক অথবা শকুন ভূতপ্রেত,
তাদের সবার হাতে তরোয়াল আর নরমুণ্ড।
আমাকে বৃত্তের মতো ঘিরে ধরে লোফালুফি খেলে
একজন নরমুণ্ড শূন্যে ছুড়ে দিলে আর একজন লুফে নেয়
আবার সে লুফে নিয়ে ছুড়ে দিলে অন্যজন বাড়ায় দু-হাত,
খেলতে খেলতে জীবনের প্রচণ্ড উন্মাদনায় যার হাত থেকে পড়ে যায়
মৃত মানুষের মাথা তাকে ঘিরে শুরু হয় ডাকিনীযোগিনী কাক
শকুনির নাচ।
কুকুর শিয়াল সাজা লোকগুলি কিছুটা তফাতে সরে গিয়ে বসে থাকে
রক্তমদের নেশায়, মশালের আলোকিত বোলান গানের গূঢ়
শরীরবন্ধন ছেড়ে অদ্ভুত শূন্যের চারপাশে প্রাণহীন
নরমুণ্ডগুলি
কত বর্ষ শতাব্দীর কালের করাল গ্রাসে তবুও অক্ষত
দাঁত বের করে তীক্ষ্ণকণ্ঠের উল্লাসে হাসে।
ছায়া
তোমার সমুদ্রস্নাত শরীর দেখিয়া মনে হইল অগাধ আলো।
ছায়া মিলাইয়া গেল দূরে দূরে, অথচ গাহিয়া
উঠিলে তুমি যে বড়ো, ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’
তখন আমার এই মনের ভিতরে আর
মনের বাহিরে শুধু একটি কথাই অনুরণিত হইতে
লাগিল তোমার এত আলো থাকিতে কেন গাহিলে
এ গান, সরিয়া গিয়া দাঁড়াইলাম, আকাশে চোখ
ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া দেখিলাম কোথাও কি মেঘ জমিয়াছে?
মেঘ কিংবা বিরাট গাছের ছায়া যদিও বা
না থাকে, তবুও এক জীবনের ছায়া আর এক
জীবনের উপর পড়িয়া ঘনাইয়া তোলে শঙ্খলাগা দুটি
সাপ যেন, সে ছায়ায় মানুষ মৃত্যুর রূপ, শান্তি
সুখের অনাবিল হৃদ্যতা খুঁজিয়া পায়, এ
দু’য়ের অনুভব কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা।
বহুদূর বালুচরে এমন শীতল এক অনুভূতি দিয়া
বুকের উপর ল্যাপ্টাইয়া রহিয়াছ তুমি:
মৃত্যুর গভীর ছায়া, অথবা অগাধ
সুখের অবর্ণনীয় মায়া, মৃত্যু মানুষের চোখে
অবাধে আনিয়া দেয় জল,
আবার সুখেও দেখি মানুষ কাঁদিয়া ওঠে।
নতুন নগর
অভয়ামঙ্গলের সে পুরোনো খোলস ছেড়ে
নবনির্মিত গল্পের নরম পোশাক পরে
শঙ্খমুখের মেজাজে হেলতেদুলতে
বেরিয়ে এল এক গোসাপ, এ জন্মে আর নিজের
রূপ বদল করে মা মঙ্গলচণ্ডীর বেশ ধরতে মন
সায় দেয় না, কেননা ফুল্লরার কুঁড়ে ছাড়া
আর কারও ঘর আলো করতে পারেনি তার দৈবিক জ্যোতি।
তবুও সমগোত্রীয় বুকে হাঁটা উভচরী প্রাণীগুলি ভাবে
এ তো কোনো সাধারণ চতুষ্পদী সরীসৃপ নয়
সেই বনানীদেবী, যে পীড়িত অরণ্যচারীদের
নির্ভয়ে বাঁচার জন্য এনেছে নতুন ভাব
ছন্দের পয়ারে বাঁধা বাণীবার্তা।
আগন্তুকের খাতিরে তারা
ডুবে ডুবে ধরে আনে চিংড়া মাছ
খুঁজে নিয়ে আসে কত বিষাক্ত সাপের ডিম,
সেসব আরাম করে খেয়ে তার ইংরেজি অয়াই
অক্ষরের মতো লিকলিকে লাল জিভ নেড়ে নিঃশব্দ ভাষণে
বোঝাল, এ বন ছেড়ে চলে যেতে হবে অন্য কোথাও, এখানে
প্রতিষ্ঠিত হবে এক নতুন নগর গুজরাট নাম যার।
তিনটি কহিতাই ভাল লাগল গৌরাঙ্গ।
ReplyDelete