গদ্যঃ পঙ্কজ চক্রবর্তী

 

পাঁচ মিনিট শ্রোতার হৃদয়

আমরা মফস্বলে ঋত্বিক ঘটক আর দেবব্রত বিশ্বাসের প্রতি অবৈধ দুর্বলতা নিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছিলাম। প্রয়োজনে সত্যজিৎ রায় বা হেমন্তর রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে অপমানসূচক মন্তব্য ছিল আমাদের ঠোঁটের গোড়ায়। অঞ্জন চৌধুরী বা স্বপন সাহার অস্তিত্ব আমরা স্বীকার করিনি নিদারুণ স্পর্ধায়। অথচ আমাদের সম্বল বলতে রবিবার দুপুরে দূরদর্শনের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি। দু-একটি সিনেক্লাব আমাদের উন্নাসিক করে রাখত। অপরের রুচিকে চলচ্চিত্র বা উপন্যাস পাঠের প্রেক্ষিতে আমরা অনেক সময় ছোটো করে দেখতাম। একজন উঠতি পরিচালকের কথায় আমরা অনেকেই রুচি খারাপ হবে বলে বাংলা বানিজ্যিক ছবি দেখা বন্ধ করেছিলাম। এমনকী উত্তম-সৌমিত্র-সাবিত্রী- ছবি বিশ্বাসের সিনেমাও তবুও নব্বইয়ের দিনগুলি ছিল অন্যরকম। আমাদের সময়ে অনুরোধের আসর ছিল জীবিত। মুর্শিদাবাদ বা চন্দননগর থেকে অদৃশ্য শ্রোতার অনুরোধে বেজে উঠত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে 'যদি নাম ধরে তারে ডাকি।' কত গান ভুল শব্দে,ভুল বিন্যাসে আমাদের স্মৃতিতে বাঁধা থাকত। শুনতে শুনতে আমরা গানের সূচনায় প্রিলিউড শুনেই বলে দিতে পারতাম গানের নাম। 'এ শুধু গানের দিন' বা 'এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না' আমরা যন্ত্রানুষঙ্গের স্মৃতি নিয়েই  মনে রেখেছিলাম। আমাদের ছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষা। শুধু শুনে শুনে আমরা অঙ্ক খাতার পিছনে লিখে রাখতাম বাংলা ছায়াছবির গান। ছবির নাম, গীতিকার ,সুরকার নিয়ে আস্ত একটা গান লেখার ডায়েরি ছিল আমার দাদার। একটা গান  লিখতে তিন চারবার শুনতে হতো। তখন গুগল নেই। লিরিক লিখে রাস্তায় গানের কথা বা সুর পাওয়ার চটজলদি সুযোগ ছিল না। আর তাই আমরা ভুল কথায় সর্বজ্ঞ হওয়ার সুযোগ পাইনি। অপেক্ষার রুচি নিয়ে আমরা কানের প্রতি ভরসা করেছি বেশি। তাই ভিন্ন এক ভুলের ছবি ছিল আমাদের গানের জীবনে। শুধুমাত্র গান শুনেই 'পিতাপুত্র','অমৃতের স্বাদ','নতুন দিনের আলো" ,'আমি সে ও সখা' এইসব অদেখা ছায়াছবির নামকে আমরা ভালোবেসেছিলাম। কত গান আজ হারিয়ে গেছে শ্রোতার অভাবে। তখন রেডিও খুললেই শোনা যেত - সেই গান কেন আমি পারিনা শোনাতে, ঐ আকাশের বুকে যেন, ছেঁড়া ছেঁড়া ফুলে, তেমন শ্রীরাধা কাঁদে, এই পথেই জীবন এই পথেই মরণ আমাদের,আমি তোমার কাছেই ফিরে আসব, ময়নামতির পথের ধারে দেখা হয়েছিল,রূপসী রুপোলি রাত, আরো কাছে এসো এসো না, নদীর যেমন ঝর্ণা আছে, তোমার দেহের ভঙ্গিমাটি এইসব গান। আজকের শ্রোতা কীভাবে খুঁজে পাবেন বাণী জয়রাম,হেমলতা,শ্যামশ্রী মজুমদার,সুমন কল্যাণপুরের গান! মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের'নিজেরে হারায়ে খুঁজি'আজ হারিয়ে গেছে।

 

খুব ছোটোবেলায় কত ভুল শব্দে রচিত হয়েছিল আমাদের গান। অচেনা শব্দের সেইসব অভিঘাত আজ কত তুচ্ছ হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু তার প্রবন্ধে ব্যবহার করেছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের 'যৌতুক'ছবির  'এই যে পথের এই দেখা' গানটি। গানের কথা সে পেয়েছে গুগল থেকে । আর এখানেই ঘটে গেছে বিপর্যয়। সে লিখছে 'তবুও হৃদয় মোর ভাবে/এ পথ কোথায় নিয়ে যাবে/ আঁধারে হারায় পাখি দিশা/তাই ,তারার প্রদীপ জ্বলে লভে।' আসলে 'পাখি' নয় শব্দটি হবে'পাছে'। এই শব্দটির ব্যবহার সম্পর্কে শ্রোতার ধারণা নেই। আবার'লভে'শব্দটি অর্থহীন। ওখানে অপ্রত্যাশিত 'নভে'অর্থাৎ নভোমন্ডলের অর্থও যিনি  টাইপ করছেন তার কাছে অচেনা। কথায় কথায় চটজলদি গুগল সমাধানের বিপর্যয় এখানেই। আমরা অনেক পরিশ্রমের মূল্যে পেয়েছিলাম একটি খাঁটি শ্রোতার হৃদয়। শুধু গান শোনার জন্য আমরা ব্যয় করেছি নির্দিষ্ট সময়। আজ সময় কারো যে নাই। বাসে ট্রেনে ইউটিউবের ভূরিভোজে গান এখন ক্লান্তি নিবারণের যান্ত্রিক উপায়। শুধু গানের জন্য সময় অপচয়ের ভুল করতে চায় না আজকের শ্রোতা। যেকোনো গান তৈরির দিনের পর দিনের পরিশ্রম উপেক্ষা করে মাত্র পাঁচ মিনিটেই একটি গানের ভালোমন্দ বিচার করে বসে আজকের শ্রোতা। হয়তো সুর কথা অবধি পৌঁছে দেয়না তাকে। 'নতুন আলুর খোসা' নিয়ে আজ তার মনে কোনো প্রশ্ন নেই। আমরাও তো সুরের মোহে ভুলে যাই একটি গানে সলিল চৌধুরীর প্রতারণা। বেশ কিছুদিন আগেও বিয়ে বাড়িতে প্রায়ই বাজত ইন্দ্রানী সেনের রিমেকে'আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের 'গানটি। এই গানে দারিদ্র্যের যে বিপর্যয় আছে কথায় , সুর তারথেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলত বিয়েবাড়িতে গানটি শেষপর্যন্ত প্রেমের। আমার ধারণা এই একটি গানেই সলিল চৌধুরী কথার বিরুদ্ধে মিথ্যে সুর আরোপ করেছেন। এই বিপর্যয়ের আরেকটি নমুনা দেওয়া যাক। হেমন্ত-সন্ধ্যার দ্বৈত কণ্ঠে 'হংসমিথুন' ছবির 'আজ কৃষ্ণচূড়ার আবির নিয়ে আকাশ খেলে হোলি'গানটি অনেকেই শুনেছেন। এই গানের শেষ লাইন 'ওগো নদীর চোখে সাগর আঁকে সাধের জলাঞ্জলি।' গীতিকার শুধু সুরের ভরসায় এখানে 'জলাঞ্জলি' শব্দটি ভুলভাবে ব্যবহার করেছেন। একজন কবির পক্ষে অসম্ভব এই শব্দটির ব্যবহার। মিথ্যে সুরের মায়ার এই প্রতারণা বুঝতে আমায় অপেক্ষায় থাকতে হল পঁচিশ বছর পর এক অতর্কিত প্রহরের।

 

স্বপ্ন ছিল তবুও আমাদের কোনো নিজস্ব গীতবিতান ছিলনা। আজকের মতো কপিরাইট উঠে গীতবিতান সহজলভ্য হয়নি। পাড়ার যেসব দিদি গান শিখতে তারা শিক্ষকের কাছ থেকে লিখে নিত কথা এবং স্বরলিপি। আর আমাদের ভরসা ছিল অনুরোধের আসরের নির্বাচিত কিছু গান। 'বসন্তে ফুল গাঁথল' কিংবা 'নয়ন ভরা জল' দিয়ে মাপা থাকত আমাদের রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা। মাইক যিনি ভাড়া দিতেন তার সম্বল একটাই ক্যাসেট যেখানে দুপিঠে কিশোর-আশার রবীন্দ্রসঙ্গীত। আলোকের এই ঝর্ণাধারায়,পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে,বড়ো আশা করে ,শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়তাম বিতৃষ্ণায়। সুবিনয় রায়, বনানী ঘোষ, সুশীল মল্লিক, সন্তোষ সেনগুপ্ত,নীলিমা সেন,অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়,পূর্বা দাম,অর্ঘ্য সেন প্রমুখের কাছে পৌঁছতে অনেক সময় লেগেছিল। রাবীন্দ্রিক সুরের অতিরিক্ত অনুশাসনে কত শব্দ যে আমরা বুঝতে পারতাম না! সুযোগ ছিলনা গীতবিতান দেখে মেলাবার। তাই 'না চাহিলে যারে পাওয়া যায়' গানটি আমাদের কাছে পৌঁছত 'নাচা হিলে যারে 'পাওয়া যায় হয়ে। সেই হিল কি বস্তু আমরা বুঝতাম না। 'বড়ো আশা করে' গানটির শেষে 'তমসঘনঘোরা গহন রজনী'র আমরা নাগাল পেতাম না। একটি অদৃশ্য ঘোড়া এসে সব তছনছ করে দিত। সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি গানটির সঞ্চারীতে আজ তো আমি ভয় করিনে আর/লীলা যদি ফুরায় হেথাকার 'এখানে পৌঁছে লীলা-নীলার ভ্রম হত মাঝেমধ্যেই।

 

একদিন চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গলায়  'মায়ার খেলা' 'কাছে ছিলে দূরে গেলে' গানটিকে ভালোবেসে ফেললাম আর শুরু হল সঞ্চারী নিয়ে সংশয়। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন'জটিল হয়েছে জাল   প্রতিকূল হল কাল /উন্মাদ তানে তানে   কেটে গেছে তাল।' এই গান যখন আমার কানে পৌঁছল  শেষের ল- বর্ণ লুপ্ত হয়ে তার রূপ দাঁড়াল'জটিল হয়েছে যা প্রতিকূল হল তা।' আমি দীর্ঘদিন বুঝতে পারিনি জটিল যা তার পুনরায় কীভাবে প্রতিকূল হতে পারে। তখন হাতে গীতবিতান নেই। কখনও এমনও হয় মনে হয় একটু ভিন্ন ভাবে দেখা যাক কোনো শব্দকে। যেমন হয়েছিল এক অধ্যাপক দম্পতির। সকালে বসে তাঁরা চা খাচ্ছেন । পাশের বাড়ির থেকে ভেসে এলো সুবিনয় রায়ের গলায় 'এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুল গুলি ঝরে/আমি কুড়িয়ে নিয়েছি তোমার চরণে দিয়েছি/লহো লহো করুন করে।' তাঁরা ভাবছিলেন 'করে'র বদলে 'কোরে'র সম্ভাবনার কথা। খুব কি বিপর্যয় ঘটতে পারে? নিশ্চয়ই। তবে বিকল্প কল্পনাটির অস্তিত্ব স্বীকার করতে পারেন একজন পাঠক। তাঁর সামনে দরকার গীতবিতানের মুদ্রিত রূপ নাহলে এইচ এম ভির কুকুর অনেক সম্ভাবনাই নষ্ট করে দিতে পারে। একটি স্মরণীয় ভুলের জন্য আমি গীতবিতানহীন কানের কাছে ঋণী। এখানে বলতে চাই 'এই করেছ ভালো' গানটির সঞ্চারীর কথা। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন 'যখন থাকে অচেতনে এ চিত্ত আমার/ আঘাত সে যে পরশ তব সেই তো পুরস্কার' এই গানটি ছোটোবেলায় পৌঁছে ছিল 'আঘাত সেজে পরশ তব'হয়ে। এই ভুলটি আজও আমার প্রিয়। এখনও তা জীবনজুড়ে মহিমান্বিত হয়ে আছে।

 

তারপর একদিন মফস্বলের ছেলেটি এসে বসল চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে বন্ধুদের আড্ডায়। জীবাশ্ম সিনেক্লাব থেকে কোনো আলো  আজ আর তার জীবনে এসে পৌঁছয় না। তবুও সে বুঝতে পারে ভীড়ের হৃদয় থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। দু-একটি সিনেমা দিয়ে তখনও প্রতিরোধ ছিল। কিন্তু একদিন তৈরি হল সেলিব্রেটি জীবনের গান। সিনেমার পরচিলকও তাঁর জীবন নিয়ে হয়ে উঠলেন সেলিব্রেটি। টিভিতে তৈরি হল মেগাসিরিয়ালের উন্মাদনা। কাজের সুযোগ। ভণ্ডামি আর দেখনদারি। একদিন তার মনে হল

ঋতুপর্ণর আবির্ভাব বাংলা সিনেমার পক্ষে ক্ষতিকর। ওঁর মধ‍্যমেধার মানস সন্তানরা বাংলা সিনেমার ক্রমাগত ক্ষতি করে চলেছেন। এরা পরিচালক হলেও সেলিব্রেটি এবং জনজীবন বিচ্ছিন্ন। অজয় কর , তরুণ মজুমদার, সলিল সেন,বিজয় বসু,চিত্ত বসু,অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়দের আমরা উপযুক্ত সম্মান দিই নি অথচ এরা প্রযুক্তির ককটেলে বাজার মাত করে জাতীয় পুরস্কার ঘরে তুলে সত‍্যজিতের উত্তরসূরি হয়ে বসে আছেন।এদের তুলনায় অঞ্জন চৌধুরী অনেক বেশি সৎ এবং মৌলিক। তারপর বাংলা ছবি চলে গেল বম্বে খ‍্যাত বাঁদরের হাতে। এমনকি একই ভিলেন আর মারুতি ভ‍্যানও বক্স অফিসের চরিত্র হয়ে উঠল। এইসব ভাবতে ভাবতে একদিন চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায় ট্রেন। উঠে আসে কানে হেডফোন নিয়ে ইউটিউব সাম্রাজ্যের মালিক। শ্রোতার  হৃদয়ে সে ধারণ করে আছে উদ্বৃত্ত পাঁচ মিনিট। কত অনায়াসে আজ বলে দেওয়া হাতের মুঠোয় পৃথিবী। গ্রামাফোনের কুকুরটির মতো এখন বোবা হয়ে আছে মফস্বলের একটি অবুঝ বিবাহযোগ্য মেয়ের গানের চরাচর।

No comments:

Post a Comment

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, কণাদ ...