গদ্যঃ সৌম্যজিৎ রজক

 

কৃষি কানুন ও লোকতন্ত্র প্রসঙ্গে ক'টা কথা

 দফায় দফায় কৃষকদের সাথে বসছে সরকার। তারিখ পে তারিখ পেরিয়ে যাচ্ছে। ফয়সলা হচ্ছে না।

 

 সরকারের কোনো আলোচনাতেই তেমন সাড়া দিচ্ছেন না কৃষকনেতারা। একটা মিটিংয়ে তো কৃষকপ্রতিনিধিরা ঘন্টার পর ঘন্টা মুখে আঙুল দিয়ে বসেছিলেন। "আমরা কিছু বলবই না! নো বাৎচিৎ!"

 

 আইন ফেরত নেবে কিনা বলো, আর কিছু শুনতেই চাই না! ওঁদের এই এক কথা, তিনটে আইন ফেরত নিতেই হবে! কানুন ওয়াপসি নেহি তো ঘর ওয়াপসি ভি নেহি! ব্যাস! একগুঁয়ের মতো বসে আছেন চাষিরা।

 

 আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই যত মতবিরোধ-বিবাদ মিটিয়ে নিতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশের এটাই রীতি। আলোচনায় গোঁ ধরে বসে থাকা এখানে মেনে নেওয়া যায়?

   

 এই এত্তবড় দেশের কৃষি ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার করতে চায় সরকার। চালু ব্যবস্থায় কৃষকরাও দারুন খুশি, এমন নয়। যদি সেরম হত তাহলে গত ৩০ বছরে ৫ লাখের কাছাকাছি কৃষককে আত্মহত্যা করতে হত না! কোটি কোটি কৃষিজীবী মানুষকে গ্রাম ছেড়ে শহরগুলোতে চলে যেতে হত না মজুরি করতে! চালু কৃষি ব্যবস্থায় বেশ কিছু বদল, কিছু নতুন পদক্ষেপ খুবই জরুরি। কিন্তু কীভাবে ঠিক হবে সেই রাস্তা?

  

 গণতান্ত্রিক দেশে অবশ্যই  গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ঠিক করতে হবে ব্যাপারটা। সরকার ও কৃষক-ক্ষেতমজুর-কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা আলাপ আলোচনা, প্রয়োজনে তর্ক-বিতর্ক করেই ঠিক করবেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেবেন, সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেবেন, এমনটাই কাম্য। সেখানে "কারোর কথা শুনব না, আমি যা বলছি তাই মানতে হবে সবাইকে"----- এমন ছেলেমানুষি জেদাজিদি একেবারেই মানায় না।

      

 জুন মাসে কড়া লকডাউন চলছে দেশে। কৃষি সংক্রান্ত তিনটে অর্ডিনান্স লাগু করা হল । না, একজন কৃষকের সাথেও কোনও আলোচনা করেনি সরকার ।  বড়-মাঝারি-ছোট-প্রান্তিক চাষিরা, ক্ষেতমজুর-ভাগচাষিরা ক্ষোভ জানিয়েছেন নিজেদের। সরকার তাদের কথায় কান দেয়নি। কয়েক মাস পরে সেই অর্ডিনান্সগুলোকে বিল আকারে পার্লামেন্টে পেশ করার আগেও কারও সাথে কোনো কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি তারা।

    

 পার্লামেন্টে তর্ক-বিতর্ক-আলাপ-আলোচনার যে পরিসর থাকে, তাকেও রেয়াত করেনি। বিরোধী সাংসদরা দাবি করেছিলেন, ভারতীয় কৃষির এত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, তাড়াহুড়ো না করে বিলগুলো সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হোক! চর্চা হোক, আলোচনা হোক, খতিয়ে দেখে পাশ হোক প্রয়োজনীয় কানুন। সরকার সেসবের ধার কাছ দিয়েও গেল না, অনড় হয়ে রইল। বিরোধী সাংসদরা রাজ্যসভায় হাত তুলে ভোটাভুটি চাইলেন। সেটাও মানল না। উল্টে 'রাজ্যসভা টিভি' মিউট করিয়ে লোক-দেখানো ধ্বনিভোটে পাশ করিয়ে নিল তিনটে বিল। যারা আলাপ-আলোচনা চেয়েছিলেন, মার্শাল দিয়ে সেই সাংসদদের বের করে দিল অধিবেশনকক্ষ থেকে। সাসপেণ্ড করে দিল।

         

 দেশের তামাম কৃষক সংগঠনের তীব্র আপত্তি। বিক্ষোভ প্রদর্শন করে গেলেন তাঁরা। সরকার তাদের মতামতকে পাত্তাই দিল না। সংসদে গায়ের জোরে পাশ হওয়া প্রস্তাবের নিচে খসখস করে সই করে দিলেন রাষ্ট্রপতি। বিলগুলো আইন হয়ে গেল।

        

৫০০-র বেশি কৃষক সংগঠন একযোগে বলে চলেছে, এ-আইনে সর্বনাশ হবে আমাদের! রাস্তায় নেমে এসে চিৎকার করে বলছেন তাঁরা, আমাদের মতামত শোনা হোক! কৃষিনীতি বানানোর আগে আলোচনা করুন কৃষকদের সাথে, কৃষিশ্রমিকদের সাথে, কৃষির সাথে যুক্ত মানুষের সাথে। আলাপে, আলোচনায় ন্যূনতম আগ্রহও দেখায়নি কেন্দ্রীয় সরকার।

        

আপনিই বলুন, এসব কি গণতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয়? নাকি স্বেচ্ছাচারের?

 

ব্যাপক আন্দোলনের চাপে কৃষক প্রতিনিধিদের সাথে  আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে সরকার। বারেবারে। বরফ গলেনি। আইনগুলো ফেরত নেবে না তারা, বড়জোর কয়েকটা সংশোধন করতে পারেন।

 মিডিয়া বলছে, দেখেছ কত গণতান্ত্রিক সরকার! আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে আইনে বদল করতেও রাজি হয়ে গেছে!

       

প্রথম কথাতো হল, আন্দোলনকারীরা কোনও সংশোধনী দাবিই করেননি। দাবি মেনে নেওয়ার দাবিটা তাই বকওয়াস!

      

  দ্বিতীয়ত, যারা আইনগুলো বানিয়েছেন এখন তারাই বলছেন এই আইনের কোন কোন জায়গাগুলো পাল্টানো যেতে পারে। তার মানে, সরকার নিজেই মানছে যে আইনগুলোতে এমন কিছু তো আছেই যা পরিবর্তনযোগ্য। গোসমেলে।

       

 যাই হোক, আন্দোলনকারীরা যে আলোচনা করতেই চান না, তেমন কিন্তু নয়। ওঁরা আলোচনা করতে রাজি। তবে সেটা আইনগুলো ফেরত না নিলে নয়। অর্থাৎ কারো সাথে আলোচনা না করে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া আইনগুলো বাতিল করো আগে, তারপর আলোচনায় বসো খোলা মনে।

          

'খোলা মনে' কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার একদিকে কৃষক সংগঠনগুলোকে চিঠি দিয়ে আলোচনায় ডাকছে, আরেকদিকে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্য বক্তৃতায় দাবি করছেন, কৃষকরা বিভ্রান্ত। অর্থাৎ তাদের দাবিও ভ্রান্ত। মন্ত্রী সান্ত্রী আক্কেল মক্কেলরা সমস্বরে বলে চলেছেন, আইনগুলো কৃষকদের স্বার্থবাহী কিন্তু চাষাভুষোগুলো ঠিক বুঝতে পারছে না! এসবের মানে কী?

        

এক মুখে এমন সব দাবি আর অন্যমুখে আলোচনায় আমন্ত্রণ। একটা কথা তো স্পষ্ট, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য যে গণতান্ত্রিক মানসিকতা, নমনীয়তা, পরমত সহিষ্ণুতা লাগে সেসব এই সরকারের রক্তে নেই। ওরা কি আদৌ আলোচনা করতে ডাকছেন কৃষকদের নাকি "আয় তোর কীসে লাভ সেইটে বোঝাই" মনোভাবে জ্ঞাণ দিতে ডাকছেন?

         

 কৃষকদের কীসে লাভ, কীসে ক্ষতি তা কৃষকরাই বোঝেন না। দুনিয়ার সব জ্ঞাণ বোধ বুদ্ধি ধুর্ততা সরকারের কয়েকজন মাতব্বরের মাথাতেই ভর করেছে যেন! এমন হাবভাব।

       

 এটা তো কেবল চাষি-ক্ষেতমজুরদের পক্ষেই অপমানজনক নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিও প্রচণ্ড অবমাননা।

  

 আসলে সমস্যাটা হয়েছে অন্যত্র। এক্কেরে গোড়ায়। শর্ত পাল্টে গেছে গণতন্ত্রের। যাদের ভোটে সরকার গড়েছেন তাদের প্রতি দায়বদ্ধ না থাকলেও চলবে, যাদের নোটে মন্ত্রী-টন্ত্রী হলেন তাদের প্রতি থাকতেই হবে! 

    

 গণতন্ত্রকে হিন্দিতে বলে 'লোকতন্ত্র'। যে দেশে পয়সা দিয়ে সমর্থন কেনা যায়, সেদেশে লোকতন্ত্রের জায়গায় নোটতন্ত্রই যে স্থাপিত হবে এতে আর আশ্চর্যের কী?

 

 ফলত প্রশ্নটা কেবলই তিনটে কানুনের নয়, সওয়াল লোকতন্ত্রের। প্রজাতন্ত্রের। প্রজাতন্ত্র দিবসের কৃষক প্যারেডে ছিল তাই রিপাবলিককে রিক্লেইম করার আহ্বান।  

 

ভোট তো গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বটেই, তাকে অস্বীকার করা মুর্খামি। কিন্তু একথাও মাথায় রাখতে হয়, নিছক ভোটে জিতেই কোনো কালে কোনো দেশে লোকতন্ত্র কায়েম করা যায়নি। যায় না। রাস্তাতেই লড়তে হয় নির্ণায়ক যুদ্ধটা।

রাস্তাতেই লেখা হয় ইতিহাস। লেখা হবে রাস্তাতেই।

No comments:

Post a Comment

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, কণাদ ...