অণুগল্প : এক নতুন রীতির সন্ধানে
এডগার অ্যালান পো, মপাসাঁ , চেখভ এবং রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে উনিশ শতকে ছোটো গল্পের সূচনা । পরবর্তীতে বিশ্বসাহিত্যে ছোটো গল্প চিরস্থায়ী আসন গ্রহণ করে । কিন্তু সাহিত্যের গলি থেকে তস্য গলিতে যদি আমরা অনুসন্ধানের আলো ফেলি তাহলে দেখব ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে বেশ কয়েকজন লেখক ভাবনাকে লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছেন সময়ের নিরিখে । ছোটো গল্পের অশ্বমেধের ঘোড়া যখন গতিশীল তখন এই লেখকরা ছোটো ছোটো ভাবনাকে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে ।
#
আসলে অণুগল্প চর্চার ইতিহাস আলোচনা করতে বসলে তাকে ছোটো গল্পের
পথ ধরেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে ।
বিশ্বসাহিত্যে অণুগল্প এই শিরোনামে
কোন গল্প লেখা হয়না সম্ভবত । এক হিসেবে এর আবির্ভাব যদিও বাংলায় , তবে
আজ সর্বত্র
এর চর্চা ।
#
অণুগল্প আজ বেশ পরিচিত নাম । অণুগল্প চর্চায় বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়কে বাদ
দিয়ে এগোনো সম্ভব নয় । তবে তিনি নতুন ছোটো গল্প হিসেবে এগুলিকে দেখেছিলেন । পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথেষ্ট করতেন এই গল্পগুলিকে নিয়ে । এমনকি পোস্টকার্ড গল্প ভাবনার কথা পাওয়া
যায় । আসলে তার পূর্বেই রবীন্দ্রনাথ ' লিপিকা '(১৯২২) - য় ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোকে গল্পের আকারে কিন্তু সংক্ষিপ্ত , তুলে ধরেছিলেন , এক নতুন পরীক্ষার জন্য । কিন্তু এক্ষেত্রে লিপিকার ভেতর কবিতার
ভাব বেশি ছিল । অর্থাৎ কাব্যধর্মী । তা অনুগল্পের ধর্মকে
ব্যাহত করেছে । আসলে অণু গল্প ও কবিতা একদমই ভিন্ন
মাধ্যম । কখনোই তাদের কাছাকাছি বলা উচিত নয়।
#
১৯৭০ সালে 'পত্রাণু ' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন সম্পাদক
অমিয় চট্টোপাধ্যায়। সেখানেই সম্ভবত সচেতনভাবে অণুগল্প নামটির উল্লেখ রয়েছে । বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষায় অণু গল্প চর্চা বিরাট আকার ধারণ করেছে । শুধুমাত্র পত্র-পত্রিকা নয় , ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অণুগল্পের বই প্রকাশ
পাচ্ছে। ফলে তা নিয়ে আজ আলোচনা জরুরী হয়ে
পড়েছে। অনেক সময় এই অণুগল্পকে বা গল্পের পালাবদলকে
শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন বলা হয় ।
আসাম , ত্রিপুরা, বাংলাদেশ , ঝাড়খন্ড ইত্যাদি জায়গাতেও পশ্চিমবঙ্গের মতই অণু গল্প চর্চা
শুরু হয়েছে বেশ কয়েক দশক ধরে । এই গল্পগুলিতে জীবনের একটা অন্য দিক প্রকাশ পাচ্ছে সহজ ভাবনার মাধ্যমে । প্রসঙ্গত জানাই অণু গল্পকে কখনো কখনো মিনি গল্প বলা হচ্ছে । আবার পরীক্ষা মূলক ভাবে ১০ টি শব্দের অথবা ৩০ টি শব্দের অথবা ৫০/১০০ শব্দের অণুগল্প লেখা হচ্ছে । এতে করে এই নতুন শিল্পটির দিগন্ত বিস্তৃত হচ্ছে বলাই বাহুল্য
। বহু অণুগল্প আছে যা বাংলা সাহিত্যের
সমৃদ্ধিতে কাজ করেছে । এই অণুগল্প একদিক থেকে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের মত। এবার অণুগল্পের দুটি আলাদা আলাদা ভাবনা নিয়ে কথা বলার
সময় এসেছে।
#
আমরা কাফকা , হোসে মারিয়া মেরিনো, হেমিংওয়ে , মন্টেরোসোর অণুগল্প পাঠ করেছি । ২০ শব্দ থেকে ২৫ শব্দের গল্পকে যেমন বলা হয় টুইটার ফিকশন ; আবার হেমিংওয়ের ৬ শব্দের বা মন্টেরোসোরের ৭ শব্দের গল্প উল্লেখ করতে হয় । তবে বলা হলো না আরেকজনের কথা । তিনি শার্ল বোদলেয়ার । তাঁর 'প্যারিস সপ্নীন ' (১৮৬৪) লিপিকা জাতীয় রচনা। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই তিনি ' গদ্যে ছোট কবিতা ' লেখা শুরু করেন । কিন্তু এই গ্রন্থের লেখাগুলো পড়তে পড়তে পাঠক অণুগল্পের
একটা চাল পাবেন । কত সহজ হতে পারেন তিনি , আবার সেইসঙ্গে গভীর অনুভূতিপ্রবণ , তা 'প্যারিস সপ্লীন' -- এর পাতায় পাতায় ধরা আছে ।
#
কিন্তু যে কথা বলছিলাম , অণুগল্পের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন ভাবনা
আমার চোখে পড়েছে । এতে প্লট থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে । অন্যদিকে চন্দন ঘোষ একটি সাক্ষাৎকারে (' দৌড় 'পত্রিকা) জানাচ্ছেন অণুগল্পের কাঙ্ক্ষিত রূপটি সম্বন্ধে। " ...অণুগল্প খুব নিরীহ বা চমকহীন ভাবে শুরু
হলেও তার ক্ল্যাইম্যাক্সে যেতে পারে । আবার শুরুতে চমক থাকতে পারে । তবে কোনও এক সময় একটা জাম্প বা
উল্লম্ফন একটা ঝলক বা ফ্ল্যাশের মতো
আসবে যা পাঠককে একটা ঝাঁকুনি দেবে । " এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন , ছোটোগল্প আর অণুগল্প
এক জিনিস নয় । ছোটো গল্পকে ছোটো করে অণুগল্প করা যায়
না ।
আসলে অণুগল্পের নিজস্ব সত্তা রয়েছে
।
তার গঠন আলাদা ।
#
ইংরেজি সাহিত্যে শর্ট শর্ট স্টোরি , মিনিসাগা, ন্যানো ফিকশন , সাডেন ফিকশন , ফ্ল্যাশ ফিকশন ইত্যাদি নামকরণ রয়েছে । বাংলায় 'অণুগল্প' নামটি বহুল পরিচিত ।
এছাড়া অতি ছোট গল্প , এক মিনিটের গল্প , এক ফোঁটা গল্প , ক্ষুদ্র গল্প , মুহূর্ত গল্প , ঝুরোগল্প , চূর্ণক গল্প ইত্যাদি নামও সময় বিশেষে লক্ষ্য করা যায় ।
#
পশ্চিমবঙ্গে পত্রাণু , দৌড় , ইলশেগুঁড়ি , সবুজের কাছাকাছি , কালিমাটি অল্প কথার গল্প , ইশক্রা ইত্যাদি পত্রিকা মাঝেমধ্যে অথবা নিয়মিত অণুগল্পের চর্চা করছে । আসামের অণুগল্প চর্চার লিটিল ম্যাগাজিনগুলো
হল ফিনকি , প্রবাহ , যাপনকথা , উড়ো পাখি , বনফুল ইত্যাদি। ত্রিপুরায় প্রকাশিত বজ্রকন্ঠ , দোপাতা ইত্যাদি পত্রিকা মধ্যে মধ্যে অণুগল্প সংখ্যা প্রকাশ করেছে
। ত্রিপুরার প্রচুর লেখক অণুগল্প চর্চা
করেন । এছাড়া ঝাড়খন্ডে , বিহারে , মহারাষ্ট্রের পত্রপত্রিকায় বাংলা অণুগল্প
প্রকাশিত হয় নিয়মিত । পাশের
রাষ্ট্র বাংলাদেশ । সেখানেও অণুগল্প চর্চা অব্যাহত । রাজনৈতিক , সামাজিক , মানবিক বিপর্যয় , জীবন সংগ্রামের নানা দিক অণুগল্পগুলির কাহিনী গঠনে সাহায্য করে। অন্যান্য ভাষাতেও এই অণু চর্চা অব্যাহত
। অসমীয়া, ওড়িয়া ইত্যাদি ভাষার লেখকরা আজ নিয়মিত অণুগল্প লিখছেন।
#
No comments:
Post a Comment