চতুষ্কোণ : এক বাতুলের বায়ুগ্রস্থ জীবন চরিত
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসটি ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয়। তার দু’বছর পর তিনি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রত্যক্ষ ভাবে যোগদান করেন। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টিতে রিয়ালিজম এবং মার্কসবাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের প্রভাবও তাঁর সাহিত্য কর্মে লক্ষ্য করা যায়। তাঁর ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘শহরতনীর কথা’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’ প্রভৃতি উপন্যাসগুলিতে রিয়ালিজম ও ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ফ্ল্যবেয়ার, বালজ্যাক এবং মোপাসাঁ, স্তাঁদাল প্রমুখ সাহিত্যিকের হাত ধরে সাহিত্যে রিয়ালিজমের আর্বিভাব। তবে ফ্ল্যবেয়ার, বালজাক এবং মোপসাঁ প্রমুখ সাহিত্যিকদের রচনার মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে আমেরিকান বাস্তববাদী লেখক শেরউড অ্যাণ্ডারসন, জন স্টেইন বেকের রচনা শৈলীর মধ্যেও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তবে ফ্ল্যাবেয়ারের- ‘মাদার বোভারি’ (১৯৭৫) এবং বালজাক-এর ‘La Comedic humaine’ উপন্যাস দুটি নিখুঁত বাস্তববাদের উদাহরণ বলাযেতে পারে। এরপর ফ্রান্সের ‘রিয়েলিজম্’ এগিয়ে চলে ‘ন্যাচারলিজ্ম’- এর দিকে। উনিশ-বিশ শতকের সন্ধিক্ষণ এবং বিশ শতকের প্রথমভাগে ইংরেজি উপন্যাসে গলস্ওয়ার্দি, হার্ডি-ও কনরাড, জার্মান উপন্যাসে টমাসমান ও হেরমান হেসে বাস্তবতাকে দেখলেন অন্যভাবে। বাস্তবতার বহিরাবরণ নয়, ঔপন্যাসিকদের লক্ষ্য হয়ে উঠল বাস্তবতার অন্তর সত্য। অর্থাৎ রিয়েলিটি থেকে ট্রুথ্-এর দিকে যাত্রা। যেমন- গলস্ওয়ার্দি্র উপন্যাসে সময় ও সমাজের গতিশীলতা, বিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তির অস্তিত্বের সংঘাতের মধ্য দিয়ে এক নৈর্ব্যক্তিক জীবন সত্যের নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হল। টমাসমান তাঁর উপন্যাসে রিয়েলিজমকে দেখেছেন লোভ, কাম, বিকার, নৈঃসঙ্গবোধ, পাপবোধের মধ্য দিয়ে। হেসে-র অনুভবেও জীবনের অর্থ সন্ধান এক দার্শনিক উপলব্ধিময় চরিতার্থতায় গিয়ে পৌঁছয়। হেসে’র উপন্যাসে রিয়েলি্জ্ম-এর রীতি নেই, আছে রিয়েলিটির নির্যাস। স্বপ্ন-সংস্কার বাসনার পুঞ্জিত প্রবাহ হৃদয়কে আমাদের অধীন করে রাখেনি। সেই সঙ্গে মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রবৃত্তিগুলিও ধীরে ধীরে সাহিত্যের আঙিনায় স্থান করে নিতে লাগল। জন্ম নিল সাহিত্যের এক নতুন ধারা ‘স্ট্রীম অব কনশাসনেস’। আবার এইচ.ডি.লরেন্স তাঁর উপন্যাসে প্রচলিত অর্থে রিয়েলিজম-কে না ভেঙেই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে সত্য রূপ দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত মনঃসমীক্ষণ রীতির উপন্যাসের উদাহরণ নেই বললেই চলে। তবে বাংলা কথাসাহিত্যের জগতে লরেন্সের মতো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই একমাত্র একাধিক উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার চমকপ্রদ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। লেখকের ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসটি মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার চরমতম নিদর্শন।
উপন্যাসটির
সূচনাতে লেখক বলেছেন-
“রাজকুমারের মতো
অসংখ্য ছেলে দেখেছি। তারা নানা রকম, কিন্তু আসলে এক। রাজকুমারকে ‘টাইপ’ বলে ধরলে
ভুল করা হবে। একজনের মধ্যে অনেককে রূপ দেবার চেষ্টা করছি। এই ‘অনেক’ যারা, তাদের
মধ্যে মূলগত মিল আছে, তাই এটা সম্ভব হল। রাজকুমার একটু বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে
উঠেছে। কিন্তু তাতে কিছু আসবে যাবে কি? আমার উদ্দেশ্যও তাই ছিল।”
উপন্যাসটিতে
‘সময়’ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই লেখক বলেছেন, ‘একজনের মধ্যে
অনেককে রূপ দেবার চেষ্টা করছি’। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে সামাজিক
অস্থিরতা এবং দিশাহীন অর্থনৈতিক অবস্থার বেশির ভাগ বাঙালি যুবকদেরকে জীবনে লক্ষ্য
ভ্রষ্ট ভবঘুরে বেকার যুবকে পরিণত করেছিল।
এই রকম পরিস্থিতিতে যুবকদের মানসিক উদ্বেগ-চাঞ্চল্য অস্থিরতাকে ফ্রয়েডের
মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার দ্বারা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে চিত্রিত করেছেন। উপন্যাসটিতে
‘রাজকুমার’ সেই সমস্ত যুবকদের প্রতিনিধি। রাজকুমার একজন শিক্ষিত যুবক। কিন্তু সে
জীবনে দিশাহীনভাবে ঘুরে চলেছে উপন্যাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। তার বন্ধুদের
মধ্যে কেউ কেউ ডাক্তার, আবার কেউ সরকারের উচ্চপদে কর্মরত। উপন্যাসটিতে কোথাও
রাজকুমারের জীবিকার কথা বা অর্থনৈতিক উৎসের কথা বলা হয়নি। কিন্তু উপন্যাসটি পাঠের
মধ্য দিয়ে এতটুকু বোঝা যায় যে, রাজকুমারও কোন সরকারী পদে কর্মরত। কিন্তু সে প্রথম
থেকেই দিশাহীন। উপন্যাসটি পাঠ করে মনে হয়েছে রাজকুমার একজন উচ্চবৃত্ত সম্ভ্রান্ত
বংশেরই সন্তান। সময়ের স্রোতের তার কিয়দংশ মাত্র অবশিষ্ট। উপন্যাসটির সূচনাতে
মনোরমা এবং রাজকুমারের সম্পর্ক সূত্রের বিবরণ দিতে গিয়ে লেখক এক জায়গায় বলছেন-
“বাড়ির দোতালায়
অর্ধেক দখল করিয়া আছে স্বামী পুত্র এবং স্বামীর দুটি ভাইবোন সহ মনোরমা নামে
রাজকুমারের এক দূর সম্পর্কের দিদি। প্রথমে তারা ভাড়াটে হিসেবেই আসিয়াছিল এবং প্রথম
মাসের বাড়ি ভাড়াও দিয়াছিল ভাড়াটে হিসাবেই। কিন্তু সেই একমাসের মধ্যে প্রায়
সম্পর্কহীন ভাইবোনের সম্পর্কটা একটু ঘনিষ্ট হইয়া দাঁড়ানোয় মনোরমা একদিন বলিয়াছিল,
দ্যাখো ভাই রাজু, তোমার হাতে ভাড়ার টাকা তুলে দিতে কেমন যেন লজ্জা করে।.... এই
জন্য সম্পর্ক আছে এমন মানুষকে ভাড়াটে নিতে অজিত বারণ করেছিল। ... সেই হইতে মনোরমা
ভাড়ার বদলে রাজকুমারকে চার বেলা খাইতে দেয়, তার ঘরখানা গুছানো ছাড়া দরকারি অন্যসব
কাজও করিয়া দেয়’।
উপন্যাসটিতে লেখকের এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে তৎকালীন
নিম্নবিত্ত বাঙালীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থানকে চিহ্নিত করেছেন। বিশ শতকের
ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে দিশাহীন অর্থনীতিতে গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষ শহরে চলে এসেছে
জীবিকার আশায়। এর ফলে এই মানুষগুলো অন্যের বাসায় ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। অর্থনৈতিক
অবস্থা যে সেই সময় ভালোছিল না তা বোঝা যায় মনোরমার একটি উক্তির মধ্য দিয়ে, ‘ভাড়ার
বদলে রাজকুমারকে চার বেলা খাইতে দেয়, তার ঘরখানা গুছানো ছাড়া দরকারি অন্যসব কাজও
করিয়া দেয়’।
আলোচনার শুরুতেই বলা হয়েছে ‘সময়’-এর কথা। ‘সময়’ এখানে একটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রীঃ)। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধ ভারতবর্ষে সংগঠিত হয়নি। কিন্তু এই যুদ্ধের প্রভাব ভারতেও পড়েছিল,
বিশেষকরে বাংলাতে। সারা বিশ্বজুড়ে একটা অর্থনৈতিক মন্দা এবং বেকারত্ব দেখা
দিয়েছিল। যার আঁচ থেকে বাংলাও রেহাই পায়নি। একই সঙ্গে ভারত তথা বাংলায় তখন শাসন
করছে ইংরেজরা। ইংরেজদের শাসন থেকে নিজেদের উন্মুক্ত করে ভারতবর্ষের দিকে দিকে
স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। এরই মধ্যে কলকাতার শিক্ষিত বেকার
যুবকদের জীবনে চলতে থাকে প্রত্যহ বেঁচে থাকার জীবন সংগ্রাম। দু-চোখে স্বপ্ন ও
বেকারত্বকে সঙ্গে নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত জীবনে সংগ্রাম করে এগিয়ে চলে সামনের দিকে।
উপন্যাসটিতে রাজকুমারের মতো শহর কলকাতার শিক্ষিত
যুবকদের একমাত্র একাকীত্বই সঙ্গী। একাকীত্বের সঙ্গে বন্ধু্ত্ব করে তাদের চলতে হয়।
মনের মধ্যে বাসাবাঁধে নানা ধরনের অসঙ্গতিমূলক কৌতূহল। তারা ভালোবাসতে চায়, কিন্তু
ভালোবাসাতেও তাদের ভয়। ভালোবাসা থেকে জ্ঞানের প্রসার সব কিছুই তাদের মিথ্যে
প্রচারের উপরে গড়ে ওঠে। সাফল্যহীন নিঃসঙ্গ জীবন তাদেরকে শেখায় চারপাশে যা গড়ে
উঠেছে সমস্তটাই ফাঁকি। উপন্যাসটিতে তাই রাজকুমারকে একজায়গায় বলতে শোনা যায়,
“বক্তৃতা শুনিয়া সকলে খুব হইহই করিয়াছে বটে শেষের দিকে,
কিন্তু নিজ সে ভুলিতে পারে নাই আগাগোড়া
সবটাই তার ফাঁকি; সকলকে ভাঁওতা দিয়া সে হাততালি পাইয়াছে এবং একটু চিন্তা করে এমন
যারা আসরে ছিল তাদের কাছে তার ফাঁকি ধরা পড়িয়া গিয়াছে।”
সে অনুভব করতে থাকে, ‘আবার কি মাথা ধরিয়াছে
তার?’ ‘কেমন একটা ভোঁতা যন্ত্রণা বোধ হইতেছে মাথার মধ্যে।’ তার চারকোনা ঘরের বাতাস
চারিদিক থেকে যেন তার মাথায়
চাপ দিচ্ছে।
উপন্যাসটি শুরু হয়েছে রাজকুমারের মাথা ধরা প্রসঙ্গের সূত্র ধরে। রাজকুমার জানে না
কেন তার মাথা ধরে। সে বলে- “শরীরের সমস্ত কলকব্জাগুলিই মোটামুটি এতখানি ঠিক আছে যে
মাঝে মাঝে মাথাধরার জন্য তাদের কোনোটিকেই দায়ি করা যায় না। তবু মাঝে মাঝে মাথা
ধরে”। এখানে লেখকের বিজ্ঞান সত্ত্বা কাজ করেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন
বিজ্ঞানের ছাত্র। তিনি জানতেন মানুষের মনের সঙ্গে মস্তিষ্কের একটা যোগ রয়েছে। তাই
রাজকুমারের মন যখন নানা চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়ে উদভ্রান্তের মতো তার সমাধান
খোঁজার চেষ্টা নিরন্তর করে চলেছে। কিন্তু সমাধান যখন কিছুই হয়নি। তখনই তার
মস্তিকের ভেতর ‘নদীতে জোয়ার আসার মত ঢেউ এসে একটা ভোঁতা দুর্বোধ্য যন্ত্রণার
সঞ্চার করে’। তখন মাথাধরা কমানোর ওষুধে শুধু যন্ত্রণার তীব্রতা বাড়ে, ঘুমের ওষুধে
যন্ত্রণাটা যেন আরও বেশি ভোঁতা আর ভারী হয়ে দম আটকিয়ে দিতে চায় তৎকালীন সামাজিক ও
অর্থনৈতিক অবস্থা যা রাজকুমারের মতো মানুষদের জীবনে ঘনীয়ে তুলেছি্লো একে অপরের
প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থা। সেই সঙ্গে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার নানা অনৈতিক পথ। তাই
উপন্যাসের এক জায়গায় রাজকুমারেকে বলতে শোনা যায়-
“এই ঘরে মাথাধরার যন্ত্রণা সহ্য করিবার
মধ্যেও যেন মৃদু একটু শান্তি আর সান্ত্বনার আমেজ আছে। জগতের কোটি কোটি ঘরের মধ্যে
এই চারকোনা ঘরটিতেই কেবল নির্বিকার অবহেলার সঙ্গে গা এলাইয়া দিয়া সে মাথা্র যন্ত্রণায়
কাবু হইতে পারে”।
সামাজিক পরিবেশ যা মনের উপর প্রভাব বিস্তার
করে। সেটাই লেখক রাজকুমারে চরিত্রটির মধ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। চরিত্রটিতে যে
মানসিক দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে তা ফ্রয়েডের নির্জ্ঞান মনের (থিয়োরি অব আনকনশাস্)
তত্ত্বের দ্বারা বিশ্লেষিত। ফ্রয়েডের এই নির্জন তত্ত্বে আছে- সচেতন বা বেতন স্তরের
হারিয়ে যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা, কামনা-বাসনা, স্বপ্ন কল্পনা, অসম্পাদিত কাব্যের
প্রকল্পনা, প্রবৃত্তির তাড়না ইত্যাদি। যা অনিষ্পন্ন সেগুলোই অবচেতনের সঞ্চয়।
ফ্রয়েডের মতে, অবচতেন মন বিভিন্ন সহজাত প্রবৃত্তির সমাবয়ে গঠিত। শিশুর জৈবিকতার
বিকাশের মতোই মানুষের প্রকৃতির উদ্দেশ্য তৃপ্তির অন্বেষণ। এই প্রবৃত্তি ও তৃপ্তির
আদত চেহারা আদিম ও বন্য। অবচেতন স্তরে জমে থাকা কামনা-বাসনা সব সময়েই চেতন স্তরে
ওঠে আসতে চায়। কিন্তু এই আদিম কামনার অন্তর আক্রমণ মানুষকে সহজে বন্য, আদিম বা উন্মুক্ত
করে তুলতে পারে না। কেননা ফ্রয়েড লক্ষ্য করেছেন মানুষের চেতন স্তর আর অবচেতনস্তরের
মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মানুষেরই অন্য এক সত্তা। যিনি সর্বদা প্রবৃত্তির সমাজ
অননুমোদিত বেগকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফ্রয়েড যার নাম দিয়েছেন সুপার ইগো বা
‘অধিশাত্তা’। অর্থাৎ ফ্রয়েডের অতিধায় চেতনও অবচেতন ছাড়া সবচেয়ে বিস্তৃত মনাংশের
নাম নির্জ্ঞান। মানুষের কোনো অভিজ্ঞতাই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেগুলি জমা থাকে
নির্জ্ঞান-স্তরে। স্বপ্ন সরণি ধরে তা কখনও কখনও উঠে আসে অবচেতনার দ্বারদেশ
পর্যন্ত। ফ্রয়েডের কথানুযায়ী মানুষের কামনার প্রবৃত্তি সকল ইচ্ছা ও কর্মশক্তিকে
চালিত করে। সেই কর্মের যা কিছু মানুষকে জীবনমুখী করে তোলে তাই-ই বিবেচ্য। কিন্তু
কামনার তৃপ্তির ব্যর্থতাই তাকে পর্ব থেকে পর্বান্তরে নিয়ে যায়। তাই মানুষের জীবন
গড়ে ওঠে অসংখ্য ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে- যে ব্যর্থতা শুরু হয় জন্মে। আর ক্ষয়বিনাশ-ব্যর্থতার
পুনরাবর্তন তাকে প্রস্থান বিন্দুর দিকে নিয়ে যায়।
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যসটিতে লেখক রাজকুমারের
লিবিডো-নিয়ন্ত্রিত জৈবিকতার আদিমতা নিয়ে বিচার করতে চাননি। তাঁর কাছে যৌনতা লক্ষ্য
নয়, উপলক্ষ্য মাত্র। তাই উপন্যাসটিতে টুকরো টুকরো মানুষের কথা উঠে এসেছে। উপন্যাসটিতে
লেখক রাজ কুমারের ভিন্ন ভিন্ন চারটি দৃষ্টিভঙ্গি বা মতাদর্শের কথা বলেননি। লেখক
চারটি নারীর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গির মধ্য দিয়ে রাজকুমারের সঙ্গে তাদের
প্রেমজীবনের সম্পর্কটিকে দেখিয়েছেন। অন্যদিকে রয়েছে রাজকুমার চরিত্রটি নানা দিক
থেকে জীবনকে শুধু দেখে যাওয়া। উপন্যাসটিতে কোথাও তাকে উন্মাদ বা কামনা তাড়িত বলে
মনে হয়নি। সে মেয়েদের দেহের গঠনের সঙ্গে মনের একটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে বলে কল্পনা
করত। তাই কল্পনায় উদ্ভুত বিষয়কে সত্যরূপে জানতে রিণি বা সরসীর নগ্নদেহ দেখার কথা
প্রকাশ করেছে। তবে এর মধ্যে অসুস্থ মনোবিকারের পরিচয় অবশ্যই পাওয়া যায়। তবে এর
মধ্যে তার বিকৃত যৌন আকাঙ্খা তৃপ্তির কোনো বাসনাই লক্ষ্য করা যায় না। উপন্যাসে
রাজকুমার নিজের সম্পর্কে এক জায়গায় বলেছে-
“ধীরে ধীরে রাজকুমারের কাছে তার অস্পষ্ট
অনির্দিষ্ট অনুমান স্পষ্ট প্রমানিত সত্য হইয়া উঠিতে থাকে। দ্বিধা সন্দেহ মিলাইয়া
যায়। মাঝে মাঝে তার মনে হইতেছিল, মাথাটা বুঝি তার খারাপ হইয়া গিয়াছে, পাগলের মতো
সে অনুসরণ করিতেছে নিজের বিকৃত চিন্তার। এই আত্মগ্লানির বদলে এখন সে অনুভব করিতে
থাকে আবিষ্কারকের গর্ব”।
গিরির শাড়ির নীচ দিয়ে হার্ট পর্যবেক্ষণ এবং
খোকার হাত দুটি ছাড়াইয়া দিবার চেষ্টায় মনোরমার স্তন স্পর্শ এই দুটি ঘটনার প্রেক্ষিতে
অনেক সমালোচক ঔপন্যাসটিকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিকৃত যৌনতার চিত্রিত দলিল রূপে
দেখেছেন। কিন্তু এই বিষয়টি একেবারেই ঠিক নয়। ঔপন্যাসটিতে রাজকুমার গিরির ডুরে
শাড়ির নীচে যেখানে দুর্বল হার্ট স্পন্দিত হচ্ছিল, সেখানে হাত রেখে রাজকুমার
স্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগল। এই ঘটনাটির মধ্য দিয়ে রাজকুমারের যৌনতা
তাড়িত কামনা যতটা না প্রকাশ পেয়েছে, তার থেকে বেশি প্রকাশ পেয়েছে নির্বুদ্ধিতা। এই
বিষয়টি খুব সুন্দর ভাবে প্রকাশিত হয়েছে মনোরমার কথার মধ্য দিয়ে। সেই একমাত্র রাজকুমারকে
ভালো ভাবে অনুভব করতে পেরেছিল। তার প্রমাণ
পাওয়া যায় মনোরমার বলা কতগুলি কথার মধ্য দিয়ে।
“অতবেশি যখন তখন গিরিদের বাড়ি আর যেও না।
আহা, কেমন ধারা মানুষ ওরা তা তো জনো? গেঁয়ো অসভ্য মানুষ ওরা, কুলিমজুরদের মতো ছোটো
মন ওদের, সব কথার বিচ্ছিরি দিকটা আগে ওদের মনে আসে। বড়ো হলে ভাইবোন যদি নির্জনে
বসে গল্প করে, তাতেও ওরা ভয় পেয়ে যায়।....তুমি তো আর সামলে সুমলে চলতে জান না
নিজেকে, তাই বলছিলাম, নাই বা বেশি মেলামেশা করলে ওদের সঙ্গেঁ”।
উপন্যাসটিতে মনোরমা চরিত্রটির সংলাপের মধ্য
দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে লেখক তাদের
মানসিকতার বর্ণনা করেছেন। মনোরমা যখন গিরির প্রসঙ্গে রাজকুমারকে বলে-
“যেমন ধরো ও বাড়ির রিণি, গিরির চেয়ে বয়সেও
বড়ো এমনিও বড়ো দেখায় ওকে। সে দিন রিণিকে একা নিয়ে তুমি বায়স্কোপ দেখতে গেলে, একদিন
গিরিকে নিয়ে যাবার কথা বলে দেখো তো ওর বাপ মা কী বলে? তারপর ধরো সরসী। ওর বাড়ন্ত
গড়ন দেখলে আমারই ভয় করে, সে দিন তুমি ওর হাত ধরে টানছিলে- তামাশা করছিলে।
কিন্তু একদিন তামাশা করতে গিয়ে ওমনিভাবে
গিরির হাত ধরে টেনো দিকি কী কাণ্ড হয়। সরসীর বাপ হাসছিল, গিরির বাপ-মা তোমায়
জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে”।
অন্যদিকে রাজকুমার যে যৌনতা তাড়িত পুরুষ নয়
তা বোঝা যায় রিণির চুম্বন প্রত্যাখানের ঘটনার মধ্য দিয়ে। সে বুঝতে পারেনি,
“চুম্বনের জোর চরম মিলন পর্যন্ত টানিয়া না
চলাটাও যে যুবক-যুবতির পক্ষে সম্ভব এ ধারণাও তার নাই কিনা, তাই সে ভাবিতেও পারে
নাই রিণির আহ্বানে সাড়া দিলেও তাদের সহজ বন্ধুত্বের সম্পর্কটা বজায় থাকিবে, অসঙ্গত
ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হইয়া যাইবে না। চুম্বন অবশ্য নর নারীর মিলনেরই অঙ্গ”।
এই প্রত্যাখানের ঘটনার পর রাজকুমারকে রিণির সম্পর্কে
বলতে শোনা যায়-
“এমন একটা বিকৃত আবেষ্টনী্র মধ্যে তারা মানুষ হইয়াছে যে অস্বাভাবিক মিথ্যা অসংযমকেই তারা স্বাভাবিক সত্য বলিয়া জানিতে শিখিয়াছে। মানুষ কেবল পরের নয়, নিজেরও সংযমে বিশ্বাস করে না। অসংযমের চেয়ে সংযম যে মানুষের পক্ষে বেশি স্বাভাবিক, এ যেন কেউ কল্পনাও করিতে পারে না”।
উপন্যাসটিতে
দেখতে পাওয়া যায় রাজকুমারের মনে একটা ভাবনার উদয় হয়। সেই ভাবনাটি বাস্তবের সঙ্গে
কতটা যুক্তি সঙ্গত সেটা দেখতে গিয়েই বিপত্তি। এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসটির
কাহিনী এগিয়ে চলে। রাজকুমারের ভাবনাটি ছিল- ‘দেহের গড়নের সঙ্গে মেয়েদের মনের
ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে”। রাজকুমার মনের অলস
কল্পনার ভিত্তির রহস্যভেদের চেষ্টা করেছে রিণি, সরসী, আর মালতীর সঙ্গে আত্মীয় এবং
বন্ধু পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে কালীকে মিলিয়ে দেখার মধ্য দিয়ে। উপন্যাসটিতে তার
বিকারগ্রস্ত মনের আত্মসমীক্ষার অংশগুলিতে অর্ধস্বপ্নচারী কাল্পনিকতার অনুভব লক্ষ্য
করা যায়-
“সমুদ্রের সঙ্কেতে প্রতিবছর রাজকুমারের
সালতামামী হয়। দূরের সমুদ্র সহর তার কাছে আসে। জীবনের কয়েকটা দিন ভরিয়া থাকে ভিজা
স্পর্শ, আঁসটে গন্ধ আর বালিয়াড়ির স্বপ্ন। প্রতিমুহূর্তে তার মনে হয়, দীর্ঘকায়।
চম্পকবর্ণ। এক নারী নিঃশব্দ পদসঞ্চারে মাঠ বন নদী গ্রাম নগর পার হইয়া আগাইয়া আসিতেছে,
শ্রোণীভায়ে থমথম করিতেছে তার গমনচুম্বী রসটম্বুর দেহে স্তম্ভিত ছন্দের ঢেউ, কটিতটে
সৃষ্টি হইয়াছে নূতন দিগন্তের বঙ্কিম রেখা, মুখ ঘিরিয়া খেলা করিতেছে নিশ্বাসে
আলোড়িত মেঘ। মনে হয়, আসিতেছে”।
সমগ্র উপন্যাসটি
জুড়ে রাজকুমারকে ঘিরে যে চারটি মেয়ের জীবন আবর্তিত হয়েছিল, তারা হল- রিণি সরসী, মালতি
আর কালী। ‘উপন্যাসটির প্রাথমিক যে খসড়াটি লেখক করেছিলেন তাতেই নামকরণের একটি
ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ‘চতুষ্কোণ’- চারটি মেয়ে -১. শিক্ষিতা আধুনিক, ২. সেকেলে ধরণের,
ঘরে শিক্ষিতা, ৩. অশিক্ষিতা ৪. স্বাভাবিক। (অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পৃ.
৩৪২)। লেখক যে ধরণের মেয়েদের কথা খসড়ায় উল্লেখ করেছিলেন, তাদের সঙ্গে উপন্যাসে
বর্ণিত মেয়েদের মধ্যে অনেকাংশে মিল পাওয়া যায় না। উপন্যাসটিতে রিণি, মালতী, সরসী
এরা সকলেই আধুনিক শিক্ষিতা মেয়ে। একমাত্র গিরিই যাকে রাজকুমার মনে করে সে এখনো
নারী হয়ে উঠতে পারেনি। সেই সেকেলে ধরণের ঘরে শিক্ষিতা। অন্যদিকে কালী সে অশিক্ষিত
কিন্তু গিরির তুলনায় তাকেই যেন রাজ কুমারের জন্য অপেক্ষমান বলে মনে হয়েছে। এদের
মধ্যে লেখকের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চরিত্র হয়তো সরসী। কিন্তু নিজের নিরাবরণ
দেহটি রাজকুমারকে দেখানোর মধ্যে স্বাভাবিকতা থাকে না। এক্ষেত্রে গিরি বা কালীরাই
স্বাভাবিক। তাদের স্বাভাবিক নারী সুলভ লজ্জা, মান এবং ভয় রয়েছে। উপন্যাসটিতে চারজন
নারী তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোন থেকে রাজকুমারের অনুরাগী। কিন্তু চারজনই স্বাভাবিক পথে
রাজকুমারকে লাভে ব্যার্থ। রিণি শেষপর্যন্ত রাজকুমারকে পেয়েছে অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায়।
এর জন্য রাজকুমার নিজেকে নিজেই দায়ী করেছে। কারণ সে মেয়েদের দেহ চেতনা, সামাজিক
সংস্কার সমস্ত কিছুকেই একজন মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীর মন নিয়ে পরীক্ষা করতে
চেয়েছে। মেয়েদের ভালোবাসার সাধনায় দেহের চারপাশে তার ঘোরাঘুরি। তার কাছে নিরাবরণ
নারীদেহ দর্শন যেন এক সাধনা। সরসীর শরীর অবলোকনে তার যে মানসিক উর্ধ্বায়ন, তা যেন
এক সিদ্ধকাম সন্ন্যাসীর। কিন্তু তার জীবনে রয়েছে অর্থহীন প্রেমহীন অস্তিত্বের
যন্ত্রণা। তা তার উক্তিতে স্পষ্ট ভাবে, প্রকাশিত-
“ভাবি যে আমি
এমন সৃষ্টিছাড়া কেন। কারও সঙ্গ আমার বনে না, সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না। অন্য
সবাইকে দেখি, খুব যার সংকীর্ণ জীবন, তারও কয়েকজনের সঙ্গে সাধারণ সম্পর্ক আছে, আত্মীয়তার
বন্ধুত্বের, ঘৃণা বিদ্বেষের সম্পর্ক। কারও সঙ্গে আমার সে যোগাযোগ নেই। কী যেন
বিকার আমার মধ্যে আছে সরসী, আর দশজন স্বাভাবিক মানুষ যে জগতে সুখে বিচরণ করে আমি
সেখানে নিজের ঠাঁই খুঁজে নিতে পারি না। আমার যেন সব খাপছাড়া, উদ্ভট”।
উপন্যাসটিতে
রাজকুমার প্রথম থেকে প্রতিভাবান হতে হতে এক অর্ধ-মনোরোগী মানুষ হয়ে উঠেছে। যা তাকে
শেষ পর্যন্ত এবং ট্র্যাজিক মানুষে পরিণত, করেছে। সে নিজেকে ‘নিউরোটিক’ বা বায়ুগ্রস্থ
মানুষ বলে মনে করতে শুরু করেছে। তার ট্র্যাজিক জীবনের মধ্যে সে কিছু কিছু করে
নিজেকে চিনতে পেরেছে। তাই আলোচনার শেষে একথা বললে হয়তো ভুল হবে না যে উপন্যাসটি
লেখক যৌন পিপাসার্ত জীবনের কাহিনি হিসেবে গড়ে তোলেননি। বরং একজন ‘বায়ুগ্রস্থ’ বা
‘নিউরোটিক’ মানুষের জীবন কাহিনি হিসেবে গড়ে উঠেছে।
সহায়ক গ্রন্থ:
১) চতুষ্কোণ –
মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রকাশ ভবন; প্রথম সংস্করণ ১ লা জৈষ্ঠ্য ১৩৪৯; ১৫ই মে,
১৯৪২; প্রকাশভবন প্রথম সংস্করণ ১৫ ই শ্রাবণ ১৪২১, ১৫ই আগষ্ট ২০১৪।
২) ক্ষেত্র
গুপ্ত- বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস (পঞ্চম খন্ড); গ্রন্থনিলয়; তৃতীয় প্রকাশ
ফেব্রুয়ারি, ২০১১।
৩) সরোজ
বন্দ্যোপাধ্যায় – বাংলা উপন্যাসের কালান্তর; দে’জ পাবলিশিং, ষষ্ঠ সংস্করণ-জানুয়ারি
২০১২, মাঘ ১৪১৮

No comments:
Post a Comment